Column
দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বাড়াচ্ছে চিন

24 Feb 2017

#

বেড়ে ওঠা অর্থনৈতিক এবং আঞ্চলিক প্রভাবের সঙ্গে সঙ্গে দক্ষিন এশিয় দেশগুলিতে ক্রমাগত ভাবে নিজের প্রসার ঘটিয়ে চলছে চিন। দক্ষিণ এশিয় দেশগুলির সঙ্গে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত (ট্রেড সারপ্লাস) অবস্থায় পৌঁছে গেছে তারা, আর এর বিনিময়ে সেই সব দেশে পরিকাঠামোগত উন্নয়ন, আর্থ-সামাজিক প্রয়োজন এবং শক্তি উৎপাদন ক্ষেত্রে বিপুল বিনিয়োগ করেছে । এই দেশগুলির কাছে আস্থাভাজন হওয়ার জন্য বিপুল ঋণও দেওয়া হয়েছে তাদের। পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলংকা, মালদ্বীপ এবং নেপাল চিনের থেকে আর্থিক সহায়তা পাওয়া এরকম কিছু রাষ্ট্র।

চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দক্ষিন-পূর্ব এশিয় দেশগুলিতে তাঁর সাম্প্রতিক সফরের সময় তাদের পরিকাঠামো উন্নয়নের এক বিশাল পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছেন। ২০১৪ সালে শ্রীলংকা এবং মালদ্বীপ, ২০১৫ সালে পাকিস্তান এবং ২০১৬-তে বাংলাদেশ সফরের সময় এই সব দেশে কয়েকশো কোটি ডলারের পরিকাঠামো উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়ার কথা ঘোষণা করে চিন। এই সহায়তার উদ্দেশ্য এই সব দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ অবধি সহজে পৌঁছানো এবং সেই সংগে সেখানে  চিনে প্রস্তুত সামগ্রীর বাজার গড়ে তোলা।


শ্রীলংকার অন্য যে সব প্রকল্পের জন্য চিন বিপুল ঋণ দিয়েছিল, সেগুলির মধ্যে আছে হাম্বানতোনা পোর্ট, মাহিন্দা রাজাপক্ষা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট এবং হাম্বান্তোনায় একটি ক্রিকেট স্টেডিয়াম। দেখা গেছে, অর্থ বিনিয়োগকৃত এই সমস্ত প্রকল্পগুলি উৎপাদনহীন এবং ক্ষতিতে চলছে। এর কারণ, এগুলি বাণিজ্যিক দিয়ে বাস্তবোপযোগী ছিলনা। এগুলির ব্যর্থতা কিন্তু চিনের উদ্দেশ্যসাধন করেছে। এই মূহুর্তে শ্রীলংকার সরকারি রাজস্বের ৯০ শতাংশই যায় ঋণ পরিশোধ করতে। শ্রীলংকা জানেনা কি ভাবে এই পরিকাঠামো প্রকল্পগুলিকে লাভজনক করে তুলে ধার ফেরত দেওয়া যাবে। এই অবস্থায় এখন তারা চিনের থেকে অসম্ভব চাপের মধ্যে রয়েছে, বিশেষত কলম্বো পোর্ট সিটি প্রকল্পের ব্যাপারে, যেখানে সি সি সি দৈনিক ৩৮০,০০০ ডলার ক্ষতি হচ্ছে বলে দাবি করছে। পরিবেশ বিভাগের ছাড়পত্র না থাকায় কলম্বো পোর্ট সিটি বাতিল করে দেওয়ার চাপও আছে। কিন্তু বাতিল করার ব্যাপারে চিন মোটেই রাজি নয়, কারণ এই প্রকল্প ভারতীয় মহাসাগরে তাদের কৌশলগত অবস্থান নিশ্চিত করেছে।
২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের  ঢাকা সফরের সময়  বাংলাদেশের সঙ্গে অতি গুরুত্বপূর্ন  উন্নয়নমূলক প্রকল্পের সহযোগিতার উদ্দেশ্যে  মোট ২৪.৪৫ বিলিয়ন ডলারের ২৭টি চুক্তি স্বাক্ষরত হয় দু'দেশের মধ্যে। চিন এবং বাংলাদেশের মধ্যে চুক্তিতে পরিকাঠামো ক্ষেত্রে বিশাল চিনা বিনিয়োগ এবং ঋণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু বেশি দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই অন্যান্য দক্ষিন এশিয় দেশগুলির অভিজ্ঞতার থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত বাংলাদেশের। শ্রীলংকায় চিনা বিনিয়োগ সে দেশের প্রেসিডেন্ট মইত্রীপলা সিরিসেনার শিরঃপীড়ার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং দু'দেশের সম্পর্কে চাপা উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। পূর্ববর্তী প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপক্ষার শাসনকালে চিন শ্রীলংকাকে বৃহৎ কিছু প্রকল্প গড়ে তুলতে বিপুল ঋণ দিয়েছিল। কিন্তু এরকম বহু খবর পাওয়া গেছে যাতে কোনও রকমের বিডিং ছাড়াই চিনা কোম্পানিগুলি উৎকোচের মাধ্যমে এই সব প্রকল্প রূপায়ণের কাজ করায়ত্ত করেছে।

 

সমালোচকদের আশংকা, শ্রীলংকার পক্ষে হয়তো ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হবেনা এবং এর ফলে এই সমস্ত অতি গুরুত্বপূর্ন  প্রকল্পগুলির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেবে চিন। কলম্বো পোর্ট সিটি প্রোজেক্ট এইরকমের একটি প্রকল্প। এটি শ্রীলংকা পোর্ট অথরিটির সহযোগী  চায়না হারবার এঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির  সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান  চায়না   কমুনিকেশন কন্সট্রাকশন কোম্পানির (সি সি সি) হাতে আছে। ১.৪ বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পটি সি সি সি-কে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু দূর্নীতির দায়ে এই কোম্পানিকে ২০১৭ সাল অবধি কালো তালিকাভুক্ত করেছিল ওয়ার্ল্ড ব্যাংক। শ্রীলংকায় প্রকল্পটির শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে।

শ্রীলংকার অন্য যে সব প্রকল্পের জন্য চিন বিপুল ঋণ দিয়েছিল, সেগুলির মধ্যে আছে হাম্বানতোনা  পোর্ট,  মাহিন্দা রাজাপক্ষা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট এবং হাম্বান্তোনায়  একটি ক্রিকেট স্টেডিয়াম। দেখা গেছে, অর্থ বিনিয়োগকৃত এই  সমস্ত প্রকল্পগুলি উৎপাদনহীন এবং ক্ষতিতে চলছে। এর কারণ, এগুলি বাণিজ্যিক দিয়ে বাস্তবোপযোগী ছিলনা।  এগুলির  ব্যর্থতা কিন্তু চিনের উদ্দেশ্যসাধন করেছে। এই মূহুর্তে শ্রীলংকার সরকারি রাজস্বের ৯০ শতাংশই যায় ঋণ পরিশোধ করতে। শ্রীলংকা জানেনা কি ভাবে এই পরিকাঠামো প্রকল্পগুলিকে লাভজনক করে তুলে ধার ফেরত দেওয়া যাবে। এই অবস্থায় এখন তারা চিনের থেকে অসম্ভব চাপের মধ্যে রয়েছে, বিশেষত কলম্বো পোর্ট সিটি প্রকল্পের ব্যাপারে, যেখানে সি সি সি দৈনিক ৩৮০,০০০ ডলার ক্ষতি হচ্ছে বলে দাবি করছে। পরিবেশ বিভাগের ছাড়পত্র না থাকায় কলম্বো পোর্ট সিটি বাতিল করে দেওয়ার চাপও আছে। কিন্তু বাতিল করার ব্যাপারে চিন মোটেই রাজি নয়, কারণ এই প্রকল্প  ভারতীয় মহাসাগরে   তাদের কৌশলগত অবস্থান নিশ্চিত করেছে। 


উপায়ন্তর না থাকায় শ্রীলংকা সরকার ১.৫ বিলিয়ন ডলারের   হাম্বান্তোনা ডিপ সী প্রকল্পটির ৮০ শতাংশ ৯৯ বছরের লিজে একটি  চিনা কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ঋণের ফাঁস থেকে বাঁচতে চিনকে এই অঞ্চলে একটি ইনভেস্টমেন্ট জোনও উপহার দিতে চেয়েছে শ্রীলংকা। সম্প্রতি বৌদ্ধ  সন্যাসীদের নেতৃত্বে একটি দল দ্বীপে চিনা বিনিয়োগের সুবিধার জোনয় ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন করার বিরোধিতা করে রাস্তায়, নেমে বিক্ষোভ দেখিয়েছে। এই প্রতিবাদের প্রধান কারণ, বিশাল একটি জমি ইনভেস্টমেন্ট জোনের নামে অন্যের হাতে তুলে দিলে তা বিদেশি শক্তির কাছে স্বাধিকার হারানোর সামিল হয়।


শ্রীলংকা থেকে আসা খবরের ইঙ্গিত, চিন ওই ইনভেস্টমেন্ট জোনটি বিভিন্ন ধরণের সামগ্রী তৈরির কাজে ব্যবহার করবে এবং শ্রীলংকা ভারতের থেকে যে মুক্ত বাণিজ্যের সুবিধা পায়, তার সুবিধা নিয়ে সেগুলি ভারতে রপ্তানি করবে তারা।  সর্বোপরি, শ্রীলংকার মানুষরা চিন্তিত এই ভেবে যে, সময়ের সংগে ওই জায়গাটি চিনা কলোনিতে পরিণত হবে। একটি ঘটনায়, নরচ্ছোলাই বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ার জন্য নেওয়া ঋণ পরিশোধ  করতে না পারায় শ্রীলংকা সরকার সেটির মালিকানা এখন ডেট-ইকুইটি সোয়াপের ভিত্তিতে  চিনাদের হাতে তুলে দিচ্ছে।

হাম্বান্তোনা পোর্ট যেমন  সমুদ্রপথে চিনের সিল্ক রুটের পক্ষে অতি গুরুত্বপূর্ন কেন্দ্র, সেরকম পাকিস্তানের গদর পোর্টও ইরান এবং উপসাগরীয় দেশগুলি থেকে তেল এবং গ্যাস সরবরাহের জন্য ব্যবহৃত নির্দিষ্ট সমুদ্রপথগুলির উপর  নিয়ন্ত্রণ কায়েম করার উদ্দেশ্যে চিন ও পাকিস্তানের একটি যৌথ কর্মকেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই গদর পোর্ট চিনকে ২০৫৯ পর্যন্ত লিজে দেওয়া আছে। এই বন্দর প্রকল্পটির জন্য চিন ৩.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছিল। চিন-পাকিস্তান ইকনমিক করিডোরের মধ্যে যে সব প্রকল্প আছে, সেগুলি সব মিলিয়ে ৫১ বিলিয়ন ডলারের। চিনের অর্থানুকুল্যে গড়া এই  ইকনমিক করিডোর থেকে কে লাভবান হবে, সে বিষয়ে পাকিস্তানের মধ্যেও সন্দেহ আছে।

ছোট দেশগুলির উপর ঋণের বোঝা বেশি করে চেপে বসার সঙ্গে সঙ্গে সে সব দেশে চিন বেশি করে সুবিধাজনক অবস্থায় চলে যাচ্ছে। পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য চিনের দেওয়া ঋণ স্বাগত, কিন্তু ঋণ গ্রহীতারা যেন তার বিপদগুলির ব্যাপারে সচেতন থাকে। এই সব ঋণের অর্থনৈতিক ব্যাপারগুলিতে প্রায়ই স্বচ্ছতার অভাব থাকে। ঋণ গ্রহীতা দেশগুলির উচিত বুঝে নেওয়া এতে তারা লাভবান হবে কি হবেনা।


নেপালেও একই ঘটনা।  চিনের পরিকল্পনা কিংঘাই-তিব্বত রেলপথকে ২০২০ সালের মধ্যে নেপাল পর্যন্ত প্রসারিত করা । নেপালের ব্যাপারে চিনের আগ্রহ বৃদ্ধির প্রধান কারণ দীর্ঘদিন ধরে নেপালে চলতে থাকা অস্থিরতা এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে তিব্বত বিপদগ্রস্ত হতে পারে বলে তাদের আশংকা। নেপালের ব্যাপারে চিনের নীতিতে বেশ বড় রকমের পরিবর্তন আসে বেজিং অলিম্পিকস গেমসের অব্যবহিত আগে বিশ্বজুড়ে তিব্বতিরা চিন-বিরোধী প্রতিবাদ-বিক্ষোভ দেখানোর পর। ভারতীয় উপমহাদেশের রাষ্ট্রগুলিকে তোয়াজ করে নিজদের ঈপ্সিত 'ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড' পরিকল্পনার অংশীদার করার উদ্দেশ্যে নিজেদের অর্থনৈতিক এবং সামরিক প্রভাবকে ক্রমাগতভাবে ব্যবহার করছে চিন। 

 

ছোট দেশগুলির উপর ঋণের বোঝা বেশি করে চেপে বসার সঙ্গে সঙ্গে সে সব দেশে চিন বেশি করে সুবিধাজনক অবস্থায় চলে যাচ্ছে। পরিকাঠামো  উন্নয়নের জন্য চিনের দেওয়া ঋণ স্বাগত, কিন্তু ঋণ গ্রহীতারা যেন তার বিপদগুলির ব্যাপারে সচেতন থাকে। এই সব ঋণের   অর্থনৈতিক ব্যাপারগুলিতে প্রায়ই স্বচ্ছতার অভাব থাকে। ঋণ গ্রহীতা দেশগুলির উচিত বুঝে নেওয়া এতে তারা লাভবান হবে কি হবেনা। 




Video of the day
More Column News
Recent Photos and Videos

Web Statistics