Column
বিকৃত চিন্তার ইসলামি নেতা এখন বি এন পি-সঙ্গী

04 Aug 2013

#

"মহিলারা সবাই তাঁদের স্বামীর ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যেই থাকবেন। বাড়ির আসবাবপত্রের যত্ন নেওয়া, বাচ্চাদের মানুষ করা--এই হচ্ছে আপনাদের কাজ। আপনারা কেন বাইরে বেরোবেন ?" সম্প্রতি এই কথাগুলি বলেছেন বি এন পি'র মিত্র হিফাজত-এ-ইসলামের প্রধান আল্লামা আহমেদ শফি।

 চট্টগ্রামের হাথাজারি মাদ্রাসার অধ্যক্ষ আল্লামা শফি, বর্তমানে যিনি বাংলাদেশে প্রকাশমান চরমপন্থী ইসলামিদের নেতৃত্বে, মনে করেন মহিলাদের ভূমিকা  পুরুষের অনুগত গৃহসঙ্গিনীর বেশি আর কিছু হওয়া উচিত নয়।

 
মহিলাদের তিনি এই বলে সতর্ক করে দিয়েছেন,"বাড়ির বাইরে বেরোবেননা। রাস্তায়, স্টেশনে, বাজারে নগ্ন হয়ে ঘুরে বেড়াবেননা। সাবধান! দোকানে যাওয়ার কোনও দরকার নেই। স্বামী এবং ছেলেকে বলুন যা লাগে কিনে এনে দিতে। আপনি কেন বাইরে যাবেন?"
 
বি এন পি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন ১৮-দলের জোটের মিত্র এবং পাঁচটি শহরে সাম্প্রতিক পুর নির্বাচনে প্রচারে অংশ নেওয়া হিফাজত-এ-ইসলামের আমির আরও বলেছেন " মহিলাদের দেখলে আপনাদের মনে কামনা জেগে ওঠে, ইচ্ছা করে তাদের বিয়ে করতে--সে ভালবেসে হোক অথবা অন্যভাবে। যদি মেয়েদের সঙ্গে পড়াশোনা করেন, তা হলে আপনি নিজেকে দমন করতে পারবেনা।"
 
"যত ধার্মিকই আপনি হোননা কেন, যদি একজন মহিলার সঙ্গে করমর্দন করেন, তবে আপনার মনে কু-ইচ্ছা আসবে। এ হল মনের \'জিনা\'(অবৈধ যৌন কর্ম), যা অচিরেই সত্যিকারের জিনায় পরিনত হয়।" এই বলেই উচ্চস্বরে তিনি বলেন " যদি কোনও পুরুষ আমায় বলে যে, কোনও মহিলাকে দেখে তার মনে খারাপ অভিসন্ধি জাগেনা, তবে আমি বলব, ওহে বৃদ্ধ! তুমি বীর্যহীনতায় ভুগছ। তোমার পুরুষত্ব বিদায় নিয়েছে। তাই অল্পবয়সী মেয়ে দেখলে তোমার মনে কামনা জাগেনা!"
 
এর পরে শফি বলেন," মহিলারা স্কুলে যায়, কলেজে যায়।কিন্তু তাদের চতুর্থ বা পঞ্চম শ্রেনীর বেশি পড়ার কোনও দরকার নেই। বিয়ের পরে স্বামীর আয়-ব্যায়ের হিসেব রাখার কাজই তাদের পক্ষে যথেষ্ট।"
 
এর ব্যাখ্যা করে পিতাদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেছেন, "আপনি লাখ লাখ টাকা খরচ করে মেয়েকে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাচ্ছেন। কিন্তু এরপরে একদিন আপনার মেয়ে তার স্বামী খুঁজে নেবে--ভালবেসেই হোক বা দেখাশোনার মাধ্যমে অথবা পুরুষ বন্ধুর সঙ্গে পালিয়ে বিয়ে করে--তার বাবাকে তার আর মনেই পড়বেনা।"
 
মহিলাদের সম্পর্কে এইসব উক্তি করছেন একজন শফি, যাঁকে ইসলাম অনুসারিদের একজন শীর্ষ ধর্মীয় নেতা বলে মনে করা হয়। অনুগামীদের প্রতি তাঁর উপদেশ থেকে বোঝা যায়, এই শফি মহিলাদের স্বাধীনতা, শিক্ষা এবং তাঁদের চাকরি করার সম্পূর্ন বিরোধী। তাঁর বক্তৃতার ভিডিও ক্লিপিং এখন ফেসবুক অথবা ইউটিউবেও পাওয়া ্যাচ্ছে। এই শফি দেশের কাওয়ামি মাদ্রাসা এডুকেশন বোর্ডেরও প্রধান।
 
ভিডিও ক্লিপে দেখা যায় শফি অনুগামীদের বলছেন, "কেন আপনারা আপনাদের মেয়েদের পোষাক তৈরির কারখানায় কাজ করতে পাঠাচ্ছেন? সে তো ফজর নমাজের পরে সকাল সাতটা-আটটায় কাজে বেরিয়ে যাচ্ছে আর রাত আটটা, দশটা অথবা বারোটার আগে বাড়িতে ফিরছেনা!"
 
"আপনি জানেননা কোন পুরুষের সঙ্গে আপনার মেয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। জানেননা কতটা  জিনায় জড়িত রয়েছে সে! জিনার মাধ্যমে যে টাকা সে রোজগার করছে, তাতে পরিবারের সমৃদ্ধি আসেনা।"
 
শফি এ-ও বলেছে্ন, মোবাইল ফোনের দৌরাত্মে তিনি চিন্তিত। " ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে এখন মোবাইল ফোন থাকে। ছাত্ররা স্কুল কলেজে সহপাঠিনীদের কাছ থেকে তাদের ফোন নম্বর যোগাড় করে, আবার ছাত্রীরা ছাত্রদের কাছ থেকে তাদের নম্বর নেয়। শিক্ষার নামে এই তো চলছে!"
 
তাঁর নীতিকথায় শফি পরিবার পরিকল্পনা এবং জন্ম নিয়ন্ত্রণেরও তীব্র বিরোধিতা করেছেন। পয়গম্বর মহম্মদ এগারোটি বিবাহ করেছিলেন জানিয়ে তিনি পুরুষদের চারটি পর্যন্ত বিয়ে করে যতটা সম্ভব বেশি সংখ্যায় সন্তান উৎপাদনের পরামর্শ দিয়েছেন।
 
 যেখানে মহিলা শিক্ষার বিষয়টি আরও অনেক বেশি গুরুত্ব এবং দায়বদ্ধতা দাবি করে, সেখানে মেয়েদের ব্যাপারে তাঁর মধ্যযুগীয় দৃষ্টিভঙ্গি সারা দেশকে হতবাক করে দিয়েছে। ধর্মীয় মৌলবাদিরা, যাঁরা মহিলা শিক্ষা এবং তাঁদের উন্নতির বিরোধী, তাঁরা এখন মতাদর্শ প্রচারের অঙ্গ হিসেবে মহিলাদের দাবিয়ে রাখতে এবং তাঁদের অধিকার হরণ করার অস্ত্র হিসেবে \'ফতোয়া\' জারি করছেন। এমন দৃষ্টান্ত আছে, যেখানে অনৈতিকতার অভিযোগে মহিলাদের ধর্ষণ করা হয়েছে। এই ধরণের শেষতম ঘটানাটিতে গ্রামের ইমামের হুকুমে ধর্ষণের শিকার, ১৪ বছরের হেনার জন্য বরাদ্দ হয়েছিল একশো ঘা চাবুক, তার \'অনৈতিক আচরণ\'য়ের শাস্তি হিসেবে। মেয়েটির ধর্ষণকারী, তারই এক আত্মীয়ের কিন্তু কোনও শাস্তি হয়নি। চাবুকের বাড়ি চলার মাঝপথেই মেয়েটি সংজ্ঞা হারায় এবং পরে মারাও যায়।
 
দু\'হাজার থেকে দু\'হাজার বারো সালের মধ্যে ব্যভিচারের অভিযোগে ৫০৩ জন মহিলা ধর্মীয় গোঁড়াদের ফতোয়ার শিকার হয়েছেন। এইসব মহিলারা বেশিরভাগই গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দা, যে সব জায়গায় তাঁদের \'অপরাধ\' ঠিক করে দিয়েছে প্রভাবশালী স্থানীয় নেতা অথবা মোল্লারা। দেশের যাবতীয় নিয়ম-কানুন দূরে ঠেলে সরিয়ে তারা মানুষের আচরণের সামাজিক ও নৈতিক মাপকাঠি ঠিক করে দেওয়ার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছে, ধর্মকে নিজেদের মত ব্যাখ্যা করেছে এবং সংবিধান-বহির্ভূত শাস্তির ব্যবস্থা করেছে।শফির সাম্প্রতিক মন্তব্যগুলি তাই মহিলাদের ক্রুদ্ধ করে তুলেছে। তাঁরা বলেছেন হিফাজত প্রধানের বক্তব্য থেকে মনে হচ্ছে তিনি দেশটাকে আফগানিস্তানের পথে নিয়ে যেতে চাইছেন। কিন্তু দেশের মানুষ তা হতে দেবেননা।
 
দেশে মহিলাদের উন্নয়নের জন্য নেওয়া নতুন নীতি এবং সেই লক্ষ্যে ১৯৭২ সালের সংবিধানে বিধৃত মৌলিক আদর্শ অনুসারে সংশোধনের বিরোধিতা করতেই হিফাজত-এ-ইসলামের আন্দোলন শুরু করা হয়েছে। সম্পত্তিতে মহিলাদের সম-অধিকার এবং চাকরি ও ব্যবসার ক্ষেত্রে তাঁদের জন্য সমান সুযোগ দেওয়া্র ব্যবস্থা রাখতে শেখ হাসিনা-সরকার \'ন্যাশনাল উইমেন ডেভলপমেন্ট পলিসি, ২০১২\' অনুমোদন করেছে। এই নীতি আসলে ১৯৯৭ সালে আওয়ামি লীগের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থে তৈরি করা \'উইমেন\'স ডেভলপমেন্ট পলিসি\'র নবরূপ, ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে বি এন পি যে নীতি বাতিল করে দিয়েছিল।
 
যুদ্ধাপরাধীদের সর্ব্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু হওয়া জনপ্রিয় শাহবাগ আন্দোলনের বিরোধী শক্তি হিসেবে হিফাজত আসরে অবতীর্ন হয়। রাজধানী ঢাকায় এপ্রিল মাসের ছ তারিখে একটি জনসভায় একটি ১৩-দফা সনদে যাবতীয় বিদেশী সংস্কৃতি, পুরুষ-মহিলাদের অবাধ মেলামেশা এবং মোমবাতি মিছিল নিষিদ্ধ করার দাবি তোলা হয়। এই দাবিপত্রে ঈশ্বর অবমাননা-বিরোধী আইন প্রনয়ণ করে প্রানদন্ডের ব্যবস্থা রাখা এবং \'ইসলামকে অপমানকারী\' যে কোনও ব্লগারের দৃষ্টান্তমূল শাস্তির কথাও বলা হয়েছে। এই সংগঠনের তালিবান-ধর্মী অন্যান্য দাবিগুলির মধ্যে আছে বাংলাদেশের মহিলা উন্নয়ন নীতি বর্জন করা, \'নির্ল্লজ্জ পোষাক পরা বন্ধ করা এবং আহমেদিয়াদের \'অমুসলমান\' বলে ঘোষণা করা। বিস্ময়ের ব্যাপার, বি এন পির স্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য খোন্দকার মোশারফ হোসেন এবং ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা হিফাজতের ওই জনসভায় যোগ দিয়ে দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার তরফ থেকে সংহতি প্রকাশ করে হিফাজতের দাবিগুলির প্রতি সমর্থন জানান।
 
জামাত এবং হিফাজতকে মিত্র হিসেবে পাশে নিয়ে যদি খালেদা জিয়া ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারেন, তবে দেশকে মধ্যযুগে ফিরিয়ে নিয়ে তিনি প্রগতিশীল যা কিছু নিয়ে বাংলাদেশ গর্ব বোধ করে, তা উলটে দেবেন।এর আগেই তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং প্রগতিশীলদের বিরাগভাজন হয়েছিলেন। তার কারন, খালেদা জিয়া সরকার থাকার সময় বনেটে বাংলাদেশের পতাকা লাগিয়ে  জামাত মন্ত্রীদের সরকারি গাড়ি হাঁকিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখতে হত পাকিস্তানি সেনাদের বুলেট শরীরে নিয়ে চলা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের। যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসই করতনা এবং একটি নতুন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম নেওয়া রুখতে দখলদারি পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে সহযোগিতা করেছিল, তারাই পতাকা উড়িয়ে ঘুরে বেরিয়েছে আর যাঁরা সেই পতাকার জন্য লড়াই করেছিলেন তাঁরা হয়ে গিয়েছিলেন সাধারন অসহায় পথচারী।
 
হিফাজতের সঙ্গে সম্পর্কের কারনে ইতিমধ্যেই মহিলাদের ক্রোধের কারন হয়েছে বি এন পি। পোষাক শিল্পে যুক্ত ৩৫ লক্ষ কর্মীদের ৯০ শতাংশই মহিলা। বস্ত্র রফতানি এবং পোষাক, যে দু\'টি জায়গায় মহিলাদের সংখ্যা পুরুষদের থেকে বহুগুন বেশি, সেই দু\'টি ক্ষেত্র থেকেই সব থেকে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়। দেশের ১৫ কোটি জনসংখ্যার অর্ধেকই মহিলা এবং দেশের জি ডি পি বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছেন তাঁরা। দেশে কর্মরত মহিলার সংখ্যা ২০০২-০৩ সালের এক কোটি থেকে বেড়ে এখন দাঁড়িয়েছে এক কোটি সত্তর লক্ষে। কর্মরত মহিলাদের সংখ্যা পুরুষদের অর্ধেক এবং এই অনুপাতকে মহিলাদের ক্ষমতায়নের দিক দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি বড় সাফল্য বলে মনে করা হয়। নির্বাচনে সাফল্যের সম্ভাবনা জিইয়ে রাখতে গেলে এই তথ্যগুলি ভুলে গেলে চলবেনা বি এন পির।



Video of the day
More Column News
Recent Photos and Videos

Web Statistics