Column
বাংলাদেশের পরিস্থিতিঃ একটি প্রশ্ন

08 Aug 2013

#

সংবিধানের বিধান অনুযায়ী এই বছরের ২৪ অক্টোবর সংসদের মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে।

 আর এর পরেই তদারকি সরকারের বিষয়টি নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামি লীগ এবং বিরোধী বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট পার্টির মধ্যে শুরু হয়ে যাবে মরণ-বাঁচন  লড়াই। এই মুহূর্তে, যখন বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ হতে আর কয়েক মাস মাত্র বাকী, তখন দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি হয়ে উঠেছে অগ্নিগর্ভ। এই সরকারের অধীনে কোনও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারেনা বলে জানিয়ে দিয়েছে বি এন পি। এই ব্যাপারে অনড় অবস্থান নিয়ে চলেছেন দলের প্রধান খালেদা জিয়া এবং অতীতে বাতিল হয়ে যাওয়া তদারকি সরকার-প্রথা ফিরিয়ে আনার দাবির ব্যাপারে তাঁর ও তাঁর দলের মধ্যে কোনওরকম নমনীয়তার চিহ্নমাত্র দেখা যাচ্ছেনা। অত্যন্ত জোরের সঙ্গে খালেদা জিয়া এখনও বলছেন, আওয়ামি লীগ সরকার আয়োজিত কোনও নির্বাচনে তাঁর দল অংশ নেবেনা। অপরপক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্পষ্ট ভাবে বলেছেন, অনির্বাচিত এবং অগণতান্ত্রিক তদারকি সরকার-প্রথা ফিরিয়ে আনতে দেওয়া হবেনা।

 
এর আগে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার সময় দু\'বছর বাদে গণতন্ত্রের পুনপ্রতিষ্ঠা হয় বাংলাদেশে। দু\'হাজার সাত সালের ১১ই জানুয়ারি থেকে দু\'বছর ধরে তদারকি সরকারকে সামনে রেখে পরোক্ষভাবে সামরিকবাহিনীই চালিয়েছিল দেশ শাসন।দু\'হাজার সাত সালের ২৫শে জানুয়ারির সংসদীয় নির্বাচনের ব্যাপারে একটি সর্বজনগ্রাহ্য, বিশ্বাসযোগ্য ক্রিয়াবিধি গড়ে তুলতে দেশের প্রধান দু\'টি রাজনৈতিক দল--আওয়ামি লীগ ও বি এন পি ঐক্যমতে পৌছতে ব্যর্থ হওয়াতে যে রাজনৈতিক টালমাটাল শুরু হয়, তার ফলেই এমন পরিণতি ঘটেছিল। সেই সময় ক্ষমতাসীন বি এন পি-জামাত সরকার সমস্ত প্রাতিষ্ঠানিক এবং সরকারি যন্ত্রকে পদদলিত করে নির্বাচনে কারচুপি করায় আওয়ামি লীগ এবং তাদের মিত্র রাজনৈতিক দলগুলি নির্বাচন প্রক্রিয়া থেকে বেরিয়ে আসে।
 
 
এর পর অতি অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তদারকি সরকারের বকলমে ক্ষমতা দখল করে সামরিক বাহিনী। ক্ষমতায় এসেই সেনা-সমর্থিত শাসকরা বিভিন্ন দূর্নীতির অভিযোগে আওয়ামি লীগ প্রেসিডেন্ট শেখ হাসিনা এবং বি এন পি\'র চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া সহ বহু রাজনৈতিক নেতাকে জেলে পাঠায়। একই সঙ্গে তারা নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে একটি নমনীয় সরকার গঠন করতে এবং তাতে সামরিক বাহিনীর অংশ নেওয়া সুনিশ্চিত করতে তৎপর হয়। বস্তুত,এই উদ্দেশ্যে  সেনা এবং নাগরিক সমাজের সমর্থনে \'নাগরিক শক্তি\' নামে একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করতে মুহাম্মদ ইউনুসকে রাজিও করান হয়েছিল।
 
দেশে পরোক্ষ সামরিক শাসন চিরস্থায়ী করার বেশ কয়েকটি পরিকল্পনা, যেমন কোনও ভবিষ্যৎ বিপদের সম্ভাবনা রুখতে  শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে দেশের বাইরে নির্বাসনে পাঠিয়ে আওয়ামি লীগ এবং বি এন পি\'কে শেষ করে দেওয়ার মত গুরুতর চিন্তাভাবনা কিছুদিন চালালেও শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করে দেশের রাজনৈতিক কাঠামো বদলের পরিকল্পনা বাতিল করতে হয় সেনা মদতে চলা শাসকদের।বি এন পি চেয়ারপার্সনের দুই পুত্র ছাড়া সমস্ত পরিচিত রাজনীতিকদের মুক্তি দিয়ে একটি নির্বাচিত নতুন সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে সব চেয়ে বেশী সংখ্যক মানুষ অংশ নিয়েছিলেন সর্বজনগ্রাহ্য সেই নির্বাচনে। দু\'হাজার আট সালের ২৯শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সেই নির্বাচনে নজিরবিহীন গরিষ্ঠতা নিয়ে আওয়ামি লীগ-নেতৃত্বাধীন ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি দেশের ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে দেশে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কার আপাত অবসান ঘটেছিল।
 
দু\'হাজার ন\' সালের জানুয়ারি মাসে ক্ষমতাসীন হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের সঙ্ঘাতময় রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটিয়ে বাংলাদেশকে ২০২১ সালের মধ্যে  একটি উন্নত দেশে পরিনত করার লক্ষ্যে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দেন। দেশ থেকে সন্ত্রাস নির্মূল করে সমস্ত আঞ্চলিক দেশগুলির সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার আশ্বাসও দিয়েছিলেন তিনি।
 
যা-ই দোষ থাকুকনা কেন, সেনা-সমর্থিত তদারকি সরকার কিন্তু একটি দূর্নীতি-দমন কমিশন, একটি সংস্কার-পরবর্তী পাবলিক সারভিস কমিশন, খোলনলচে বদলানো নির্বাচন কমিশন এবং প্রশাসন থেকে সম্পূর্ন আলাদা একটি বিচার ব্যবস্থা আওয়ামি লীগ সরকারের হাতে তুলে দিয়ে তাকে শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করিয়ে দিয়ে বিদায় নিয়েছিল।
 
বিপুল জনসমর্থন নিয়ে আওয়ামি লীগের ক্ষমতায় আসার পিছনে সব থেকে বড় কারন ছিল দলের নির্বাচনী ইস্তাহার, যাতে উন্নয়নের উপর জোর দেওয়া, সন্ত্রাসবাদ দমন করা এবং ২০০৭-পূর্ববর্তী সংঘাতময় রাজনীতির সংস্কৃতির অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতিসহ একটি \'পরিবর্তন-সনদ\' প্রচারিত হয়েছিল। এই লক্ষ্যে পৌঁছতে দেশে যে সক্রিয় বহুদলীয় রাজনৈতিক প্রণালী গড়ে তুলতে হয়, তার জন্য আওয়ামি
লীগ প্রেসিডেন্ট শেখ হাসিনার প্রয়োজন ছিল তাঁর নিজের দলের ভিতর এবং সরকারের মধ্যে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে শক্তিশালী করা এবং বি এন পি সহ বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলির সঙ্গে একটি সমঝোতায় আসা। কিন্তু ২০১২ সালের মধ্যেই এই সমস্ত আশাই দুরাশায় পর্যবসিত হল এবং সবকিছু ছাপিয়ে মানুষের মধ্যে এই ধারনা জন্ম নিল যে, আওয়ামি লীগ সরকার তার কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হয়েছে।
 
সংঘাতের রাজনীতির অবসান ঘটানোর সমস্ত প্রতিশ্রুতিই ব্যর্থ হয়ে যায় ২০০৮ সালের সংসদীয় নির্বাচনের অব্যবহিত পরেই। এই সময় সংসদে সদস্যদের বসার ব্যবস্থার মত আপেক্ষিকভাবে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে বি এন পি অধিবেশন বয়কট করে এবং আওয়ামি লীগ খালেদা জিয়াকে তাঁর ঢাকার ক্যান্টনমেন্টের আবাস থেকে উচ্ছেদ করে।
 
সুপ্রীম কোর্টের আদেশে তদারকি সরকার-প্রথা খারিজ হয়ে যাওয়াই বি এন পি\'র মাথাব্যথার একমাত্র কারন নয়, আদালতে চলতে থাকা মামলাগুলিতে খালেদা জিয়া অথবা তাঁর পুত্র, তারেক রহমান দোষী সাব্যস্থ হয়ে সাজা পেতে পারেন, দলের ভিতর এই দুশ্চিন্তাও আছে। খালেদা জিয়ার কনষ্ঠ পুত্র আরাফত রহমান কোকো ইতিমধ্যেই দোষী প্রমাণিত হয়েছেন। এবার খালেদা জিয়া অথবা অপর পুত্র তারেক
রহমানেরও পালা আসতে পারে। তাঁদের বিরুদ্ধে যেসব ফৌজদারি মামলা চলছে, তাতে দোষী প্রমাণিত হলে তাঁরা আর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেননা।
 
সময় যখন দ্রুত বয়ে যাচ্ছে, তখন আওয়ামি লীগ কীভাবে আগামী নির্বাচন করা যায়, তার বিভিন্ন উপায় খতিয়ে দেখছে। এর মধ্যে একটি হল বি এন পি এবং তাদের মিত্রশক্তিগুলি অংশগ্রহণ না করলেও নির্বাচন করান।" যদি একটি বা দু\'টি বিরোধী দল নির্বাচনে অংশ না নেয়, তবে সেটা তাদের সমস্যা," জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা।একই মত প্রকাশ করেছেন আওয়ামি লীগের বরিষ্ঠ নেতা এবং মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। আর একটি পথ হল, নির্বাচনকে একটি বিশ্বাসযোগ্য রূপ দিতে এরশাদ-নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিকে বিরোধী দল হিসেবে নির্বাচনে লড়তে উৎসাহিত করা এবং অন্যান্য ছোট দল এবং গোষ্ঠীগুলিকেও অংশ নিতে আমন্ত্রণ জানান। যদিও হবেনা বলেই মনে হয়, তবু এ\'রকম সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়েও দেওয়া যায়না। সমস্ত কেন্দ্রর জন্য দলীয় প্রার্থী মনোনীত করে এরশাদ ইতিমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছেন যে, তিনি
আওয়ামি লীগের জোট থেকে বেরিয়ে যেতে প্রস্তুত।
 
অন্যান্য রাস্তাগুলির মধ্যে আছে ভোটে দূর্নীতি ও কারচুপির সম্ভাবনা কমাতে একটি সর্বদলীয় \'ন্যাশনাল ইউনিটি\' সরকার গঠন করা। আওয়ামি লীগ ও জাতীয় পার্টির নেতারা সর্বদলীয় সরকার গঠনে অসন্মত নন। সংসদে প্রতিনিধিত্ব থাকা দলগুলি এই ধরনের সরকারের ক্যাবিনেট মনোনীত করতে পারেন।অবশ্য বি এন পি এর বিরোধী। এর প্রধান কারন, আওয়ামি লীগের প্রস্তাব অনুযায়ী, সংসদে প্রতিটি দলের আসন সংখ্যার অনুপাতে সরকারে দলীয় প্রতিনিধিত্ব ঠিক হওয়া উচিৎ। এই পদ্ধতি অনুসরণ করলে সংসদে বর্তমানে ৮৭ শতাংশ আসনের অধিকারী আওয়ামি লীগ বিশাল সুবিধা পাবে। এ\'ছাড়াও আওয়ামি লীগ চাইছে এই ধরণের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রেসিডেন্ট অথবা প্রধানমন্ত্রী হবেন তাদের দলেরই কেউ, যা বি এন পি\'র কাছে গ্রহনযোগ্য নয়।
 
অন্য একটি বিকল্প হতে পারে যে, আওয়ামী লীগ ও বি এন পি\'র থেকে ক্যাবিনেট মন্ত্রী মনোনীত করে একটি সর্বদলীয় সরকার করা হল, যার শীর্ষে থাকবেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী। বি এন পি এই মডেল মেনে নিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমান সরকার থেকে এখনই পদত্যাগ করতে রাজি। কিন্তু বি এন পি\'র পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এমনটা হলেও নির্বাচন কমিশনের মত গুরুত্বপূর্ন সংস্থাগুলিকে প্রভাবিত করার জায়গায় থেকে যাবে আওয়ামি লীগ। সুতরাং এই প্রস্তাবও গ্রহণযোগ্য মনে হওয়ায় বি এন পি আবার সেই তদারকি সরকারের দাবিতেই ফিরে গেছে।
 
ঘনীভূত রাজনৈতিক উত্তাপ এবং উত্তেজনার মধ্যে এর পরে কী হবে সেই চিন্তায় দেশের মানুষ উদ্বিগ্ন। লক্ষ্যে পৌঁছতে ক্ষমতাসীন এবং বিরোধী--উভয় পক্ষই রাস্তাতেই চূড়ান্ত রাজনৈতিক লড়াই লড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু সাধারন মানুষ, সংবাদ মাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং আন্তর্জাতিক জনসমাজ চায় তদারকি সরকারের বিষয়ে অচলাবস্থা কাটাতে দুই দল আলোচনায় বসে নিজেদের মধ্যে একটা জায়গায় মতৈক্যে আসুক। কিন্তু এই রাজনৈতিক সংঘাতের পরিস্থিতির অবসান ঘটার কোনও আশু সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছেনা।
 
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, সংসদীয় নির্বাচন করার ব্যাপারে উভয় দলের কাছে গ্রহণযোগ্য কোনও উপায় খুঁজে না পাওয়া গেলে হিংসাত্মক, সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে এবং তার ফলে দেশের রাজনীতিতে সামরিক বাহিনী আরও একবার হস্তক্ষেপ করার সুযোগ পাবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সঙ্কটের সার সংক্ষেপ হচ্ছে এই যে, বি এন পি চায়না তদারকি সরকার ছাড়া অন্য কারুর অধীনে নির্বাচন হতে দিতে এবং অপরপক্ষে আওয়ামি লীগ তদারকি সরকারের বিরোধী।আওয়ামি লীগের সম্মতি ছাড়া তদারকি সরকার প্রথা ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়, এবং ক্ষমতাসীন দল তা একেবারেই চাইছেনা।
 
রাজনৈতিক পরিস্থিতির তীব্র অধোগতিতে আন্তর্জাতিক মহল আশঙ্কিত যে, বাংলাদেশ আবার সংঘাতের রাজনীতির পথে এগোচ্ছে। কীভাবে অবাধ, সুষ্ঠু এবং স্বচ্ছ নির্বাচন করা যেতে পারে, সেই বিষয়ে মতানৈক্যই বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কটের মূল কারন।তবে এত কিছু সত্ত্বেও পাঁচটি বড় শহরের সাম্প্রতিক পুর নির্বাচনের ফলাফল কিন্তু এই ইঙ্গিত রেখে গেছে যে, আওয়ামি লীগ সরকারের অধীনেও অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন করা সম্ভব। বর্তমানে যা পরিস্থিতি, তা আরও অগ্নিগর্ভ হবে যদি মৌলবাদী শক্তিগুলি ক্ষমতায় আসে। এই অবস্থায় বাংলাদেশের মানুষকেই ঠিক করে নিতে হবে যে, তাঁরা আওয়ামী লীগের মত ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল সরকারকেই শ্রেয় মনে করেন, না চান দেশকে কব্জা করে নিক মৌলবাদী শক্তি, যাদের হাতে রয়েছে দেশ-ধ্বংসের চাবিকাঠি!



Video of the day
More Column News
Recent Photos and Videos

Web Statistics