Column



১৬ই ডিসেম্বর- ইতিহাসের পবিত্র আনন্দের দিনে হোক নতুন অঙ্গীকার
১৬ই ডিসেম্বর- ইতিহাসের পবিত্র আনন্দের দিনে হোক নতুন অঙ্গীকার
উনিশশো একাত্তরের ১৬ই ডিসেম্বর। বাঙালি জাতির কাছে অতি গুরুত্বপূর্ন এই ঐতিহাসিক দিনটি। তাৎপর্যপূর্ন পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসেও।

 ভাষা ও সংস্কৃতির জাতীয়তাবোধে উদ্বুদ্ধ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন, আত্মমর্যাদাবোধে বলীয়ান যে নির্ভীক  মানবসত্তা একাত্তরের ২৫শে মার্চ শিকল ছিঁড়ে ঝাঁপ দিয়েছিল সংগ্রামের বহ্নিতে, ন'মাসব্যাপী চরম আত্মোৎসর্গের পর অবশেষে তার প্রকৃত মুক্তি ঘটেছিল এই দিনটিতে। জয়ী হয়েছিল তার ইচ্ছাশক্তি আর বীরত্বের। জন্ম নিয়েছিল বাংলাদেশ, পৃথিবীর একমাত্র বাংলাভাষী রাষ্ট্র, যা জাতি হিসেবে বাঙালির উত্তরণ ঘটিয়েছে বিশ্বের আঙিনায়। ১৯৭১ সালে এই দিনেই বহু প্রতীক্ষিত স্বাধীনতা লাভ করেছিল বাংলাদেশ। 

 

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ তারিখে 'অপারেশন সার্চলাইট' নামের আড়ালে পাক বাহিনী সারা বাংলাদেশ জুড়ে শুরু করেছিল গণহত্যার তান্ডব। ৩১শে মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর আক্রমণ চালিয়ে হত্যা করা হয় অসংখ্য ছাত্র ছাত্রীকে। ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো ঘাতক বাহিনী সেই সময় এক রাত্রের মধ্যে হত্যা করেছিল ৭০০০ মানুষকে। এক সপ্তাহের মধ্যেই ঢাকার জনসংখ্যার অর্ধেক মানুষ ঘর ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন, আর খুন হয়ে গিয়েছিলেন ৩০,০০০ মানুষ। এই তথ্যের প্রমাণ রয়েছে কয়েক হাজার ঐতিহাসিক প্রতিবেদনে।
তবে এই বাংলাদেশ এক দিনে তৈরি হয়নি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে মধ্য ষাটের ছ'দফা দাবি সনদ নির্মাণ এবং তার পরে ১৯৭১-এর স্বাধীনতা সংগ্রাম-এই দীর্ঘ সময়কাল ধরে সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্খার প্রতীক হিসবে ক্রমে ক্রমে এক জন অতুলনীয় সর্বোচ্চ জাতীয় নেতা হিসবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। যে আওয়ামি লিগের নেতৃত্বে তিনি ছিলেন, সেই দল ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে মাত্র দু'টি ছাড়া সব আসনই জয় করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে অদ্বিতীয় এবং অবিসংবাদী জনপ্রতিনিধি সংগঠন হয়ে উঠেছিল।  পিছনে থাকা বিপুল জনতা পাকিস্তানের ভিতরে থাকা অথবা তার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আসার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার দিয়েছিল আওয়ামি লিগকে। একাত্তের ২৫শে মার্চের রাতে শেখ মুজিব পাকিস্তানি ফৌজের হাতে বন্দি হয়ে যাওয়ার পর তাঁর অনুগামীরা তাঁর নাম নিয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

"যার হাতে যা আছে, তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়... জয় বাংলা"- বঙ্গবন্ধুর বজ্রকন্ঠের সেই ঐতিহাসিক ডাকে সাড়া দেওয়া শত সহস্র স্বাধীনতা সংগ্রামীর চরম আত্মোত্স‌র্গের  মধ্য দিয়ে মুক্তি অর্জন করেছিল আজকের বাংলাদেশ। হিংস্র নেকড়ের মত সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের উপর  ঝাঁপিয়ে পড়া পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে  দাঁত নখ দিয়ে সেই মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা  করেছিল জামাত-এ-ইসলামি এবং তাদের সহযোগী পাকিস্তানপন্থী এবং বিশ্বাসঘাতকদের সংগঠনগুলি। জামাতের লোকেদের সহযোগিতায় যে চরম ঘৃণ্য অপরাধের ঘটনা ঘটিয়েছিল পাকিস্তানি দখলদারি বাহিনী, তাতে আনুমানিক নিহত বাঙালির সংখ্যা তিরিশ লক্ষ।  ধর্ষণ করা হয়েছিল আড়াই লক্ষের বেশি নারীকে, যার ফলে জন্ম নিয়েছিল তিরিশ হাজার অবৈধ শিশু। পৃথিবীর ইতিহাসে এ এক অন্যতম কলঙ্কময় অধ্যায়, যার তুলনীয় খুব বেশি পাওয়া যায়না। 

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ তারিখে 'অপারেশন সার্চলাইট' নামের আড়ালে পাক বাহিনী সারা বাংলাদেশ জুড়ে শুরু করেছিল গণহত্যার তান্ডব। ৩১শে মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর আক্রমণ চালিয়ে হত্যা করা হয় অসংখ্য ছাত্র ছাত্রীকে। ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো ঘাতক বাহিনী সেই সময় এক রাত্রের মধ্যে হত্যা করেছিল ৭০০০ মানুষকে। এক সপ্তাহের মধ্যেই ঢাকার জনসংখ্যার অর্ধেক মানুষ ঘর ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন, আর খুন হয়ে গিয়েছিলেন ৩০,০০০ মানুষ। এই তথ্যের প্রমাণ রয়েছে কয়েক হাজার ঐতিহাসিক প্রতিবেদনে। 

একাত্তরের ২৫শে মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ে চলা অত্যাচারের বর্ণনা দিয়ে আমেরিকান কনসুলেটের একটি প্রতিবেদনে লেখা হয়েছিল যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী নিবাস রোকেয়া হলে সিলিং-এ ঝুলন্ত ফ্যানের সঙ্গে পায়ে দড়ি বাঁধা অবস্থায় উলটো করে ঝোলানো সারি সারি নগ্ন নারী দেহ দেখা গিয়েছিল। হতভাগ্য ওই সব ছাত্রীকে ধর্ষণের পর গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল।

অত্যাচারীরা সেই সময় রাত্রে অভিযান চালিয়ে বাড়ি বাড়ি ঢুকে পরিবারের লোকজনের সামনেই যৌন অত্যাচার চালাতো মেয়েদের উপর। উদ্দেশ্য সবাইকে আতংকে স্তব্ধ করে রাখা। অল্পবয়সী মেয়ে এবং মহিলাদের অপহরণ করে বিশেষ সেনা শিবিরে নিয়ে গিয়ে গণধর্ষণ করা হত। এই নারীদের অনেকেই আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছিলেন, নয়তো তাঁদের হত্যা করা হয়েছিল। টাইম ম্যাগাজিনেও লেখা হয়েছিল সেইসব মেয়েদের কথা, যাদের অপহরণ করে নিয়ে গিয়ে সেনা শিবিরগুলিকে পরিণত করা হয়েছিল পতিতালয়ে।

বাংলাদেশের ইন্টারন্যাশনাল  ক্রাইমস ট্রাইব্যুনালে উনিশশো একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধ সংক্রান্ত বিভিন্ন মামলার শুনানি চলছে। সেখানে প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য জাগিয়ে তুলছে গণহত্যা, ধর্ষণের সেই ভয়াল স্মৃতি, যা ফিরিয়ে আনছে গণকবরে গাদা করা হাজার হাজার নিহত স্বাধীনতা সংগ্রামীর দেহ এবং অসহায় নারীদের যৌন নির্যাতন এবং হত্যার ছবি। 
 

কী বীভৎসভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা অথবা বিকলাঙ্গ করে দেওয়া হয়েছিল এবং যৌন নির্যাতনের পর অঙ্গচ্ছেদ করে মহিলাদের দেহগুলি  ঠেসে দেওয়া হয়েছিল নিকাশি নালা অথবা গণকবরে , কীভাবে পিছমোড়া করে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় হাজার হাজার মৃতদেহ ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল নদীতে, ধর্ষণ এবং ধর্ষিতাদের চরম কষ্টের কাহিনী--এ সবেরই বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া গেছে সাক্ষ্য থেকে।ব্যাপক গণহত্যা, ধর্ষণ এবং ধ্বংসের খবর ছবিসহ শিরোনামে এসেছিল অসংখ্যা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে। পিছনে হাত বাঁধা অবস্থায় নদীর জলে ভেসে যাওয়া অগুনতি লাশের খবর এবং ছবিও ছাপা হয়েছিল সেই সময়। 

রাজনৈতিক দুর্যোগের প্রলয়ে বাকরুদ্ধ দেশের মানুষ শিহরিত হয়ে উঠেছিলেন তাঁদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে, কিন্তু তবুও ফাসিস্ত পাকিস্তানি নেতাদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সংগ্রামে যেতে জাতি হিসাবে তাঁরা ছিলেন সংকল্পবদ্ধ। এটা সেই সময় ছিল, যখন রাত ভোর হওয়ার আগে রাস্তায় রাস্তায় ছড়িয়ে থাকত শব দেহ। ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস-এর সদর দপ্তর পিলখানা, রাজারবাগে পুলিশের সদর দপ্তর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বর-সর্বত্র ছড়িয়ে থাকত মৃতদেহ, শোনা যেত মূমুর্ষূ মানুষের আর্তনাদ। গ্রেপ্তার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণায় সাড়া দিয়ে তৎক্ষণাৎ গড়ে তোলা হল জনপ্রতিরোধ।

পাকিস্তানপন্থী স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিগুলি যখন বুঝতে পারল যে তাদের পরাজয় আসন্ন, তখন ১৪ই ডিসেম্বর, ১৯৭১ তারিখে  বেছে বেছে তারা সমস্ত অগ্রগণ্য বুদ্ধিজীবী এবং প্রতিষ্ঠিত পেশাদার মানুষদের তুলে নিয়ে গিয়ে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে। দেশের ইতিহাসের সবথেকে কালো এই দিনটি তাই শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস হিসেবে পালন করা হয় প্রতি বছর।


১৯৭১ সালের সেই ভয়াল সময় গণহত্যা এবং দেশত্যাগের ফলে বাংলাদেশ থেকে প্রায় দু' কোটি হিন্দু অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিলেন- পৃথিবীর সাম্প্রতিক ইতিহাসে কোনও জনজাতি অথবা ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে যা অভূতপূর্ব। ১৯৭১ সালের ২রা অগাস্ট সংখ্যায় টাইম ম্যাগাজিনে লেখা হয়েছিল, "উদ্বাস্তু হয়ে যাওয়া  মানুষদের তিন-চতুর্থাংশ এবং নিহতদের একটি বড় অংশ যে হিন্দুরা, তারাই বেশি করে মুসলমান (পাকিস্তানি) সামরিক কর্তাদের ঘৃণার শিকার হয়েছে।

 অসংখ্য ঐতিহাসিক নথিতে বলা হয়েছে যে, 'কিল বেঙ্গলিজ অ্যান্ড হিন্দুজ' স্লোগানটি ঐ সময় খুব উদ্দেশ্যমূলক ভাবে বার বার তোলা হত। 'বেঙ্গলি' শব্দটি স্বাধীনতার যোদ্ধাদের বোঝাতেই ব্যবহার করা হত। ১৯৭১ সালের ১৯শে ডিসেম্বর ডেইলি ইত্তেফাকের ব্যানার হেডলাইন ছিল,"মানব ইতিহাসের জঘন্যতম হত্যালীলা দেখল সোনার বাংলা।" ১৯৭২ সালের ১৫ই জানুয়ারি বাংলাদেশ অবজার্ভার লিখল, "বঙ্গবন্ধু বলেছেন, সোনার বাংলায় যা হয়েছে,হিটলার বেঁচে থাকলে তিনিও লজ্জা পেতেন।"

স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় যখন পাকিস্তানের লয়ালপুর জেলে বন্দী শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর দেশের মানুষদের থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরত্বে রয়েছেন, সেই সময় অসাধারন সাহস এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রকৃত পক্ষে যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধি। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম বিনষ্ট করার যে কোনও চক্রান্তের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন তিনি। 'অপারেশন সার্চলাইট' শুরু হবার ঠিক দু'দিন পরে, ২৭শে মার্চ তারিখে দৃঢ় ভাবে তিনি ঘোষণা করেন, "ভারত বাংলাদেশকে মরতে দেবেনা।" এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই মুক্তিযোদ্ধাদের প্রত্যাশা এবং আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বেড়ে গেল। মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করে সেই সময় প্রাণ দিয়েছিলেন ২০,০০০ ভারতীয় সৈনিক।

১৯৭১-এর ১৬ই ডিসেম্বর দখলদারি পাকিস্তানি ফৌজের কমান্ডিং অফিসার লেঃ জেনারেল এ এ কে নিয়াজি মিত্র শক্তির কমান্ডার লেঃ জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা কাছে সদলবলে আত্মসমর্পণ করেন, আর সেই সঙ্গে জন্ম নেয় স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশ। এই দিনটি যেমন মানুষকে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের চরম আত্মত্যাগের কথা মনে পড়িয়ে দেয়, তেমন জামাতের প্রতি ঘৃণা জাগিয়ে তোলে।

পাকিস্তানপন্থী স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিগুলি যখন বুঝতে পারল যে তাদের পরাজয় আসন্ন, তখন ১৪ই ডিসেম্বর, ১৯৭১ তারিখে বেছে বেছে তারা সমস্ত অগ্রগণ্য বুদ্ধিজীবী এবং প্রতিষ্ঠিত পেশাদার মানুষদের তুলে নিয়ে গিয়ে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে। দেশের ইতিহাসের সবথেকে কালো এই দিনটি তাই শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস হিসেবে পালন করা হয় প্রতি বছর।
 

কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ ই অগাস্টে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবিশাল প্রতীক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার পর স্বাধীনতাবিরোধী এবং পাকিস্তানপন্থি  শক্তিগুলি স্কুল-কলেজের পাঠ্যপুস্তকগুলিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের বিকৃতি ঘটানো শুরু করে। এর উদ্দেশ্য ছিল তরুণ প্রজন্মের মগজ ধোলাই এবং বিপথে চালিত করা এবং সেই সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে গুঁড়িয়ে দিতে তারা নিজেরা যে কী জঘন্য ভূমিকা পালন করেছিল, সে সম্পর্কে তরুণদের অন্ধকারে রাখা। 


পঁচাত্তরে শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার পর ধর্মনিরপেক্ষ এবং প্রগতিশীল  মানুষদের পিছু হটার সঙ্গে সঙ্গে সেই শূন্যস্থান দখল করে নেয় পাকিস্তানপন্থি ইসলামি শক্তিগুলি। নবজাতক রাষ্ট্র বাংলাদেশের স্বাধীনতা হরণ করে আবার তাকে পাকিস্তানের সংগে যুক্ত করা যে হেতু তখন আর সম্ভব ছিলনা এবং জনগণও তা মেনে নিতনা, তাই এই সব শক্তিগুলি তখন রাষ্ট্রীয় মদতে জাতির অস্তিত্বের সর্বোচ্চ গৌরবের ইতিহাসকে বিকৃত করার এক সর্বাত্মক অপচেষ্টা শুরু করে। 

সেই সময় স্কুল-কলেজের পাঠ্য বইগুলিতে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস থেকে  'পাকিস্তান' নামটি সরাসরি বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। পাকিস্তানি সেনা অথবা তাদের স্থানীয় সহযোগী, যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় নির্মমভাবে হাজার হাজার স্বাধীনতা সংগ্রামীকে হত্যা করেছিল এবং ধর্ষণ করেছিল বাঙালি নারীদের, তাদের পরিচয় ঢেকে দিয়ে উল্লেখ করা হল 'হানাদার' বলে। এর ফলে যারা এই সব অপরাধ করেছিল তারা চিহ্নিত হয়ে রইলনা, জানা গেলনা কোথা থেকেই বা তারা এসেছিল। শুধু তা-ই নয়, এই সব তথাকথিত হানাদারেরা ঠিক কী নারকীয় তাণ্ডব চালিয়েছিল এ দেশে, তার বিবরণগুলিও সরিয়ে দেওয়া হোল পাঠ্যপুস্তকের পাতা থেকে। এ সব থেকেই বোঝা যায়, তরুণ প্রজন্ম যাতে সত্যি কথা না জানতে পারে, তার জন্য কী গভীর চক্রান্ত করা হয়েছিল।

এই বিকৃত তথ্যে স্বাধীনতা সংগ্রামের তীব্র বিরোধিতা করা পাকিস্তানপন্থি ইসলামি শক্তিগুলি, বিশেষত জামাতকে চিত্রায়িত করা হয়েছে ভারতীয় আগ্রাসনের বিরোধকারী হিসেবে। পাল্টে দেওয়া পাঠ্যপুস্তকগুলিতে  জামাতকে দেখানো হয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যাকারী এবং বাংলাদেশের মা, বোন, কন্যাদের ধর্ষণকারীদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে  নয়, পাকিস্তানের সার্বভৌমত্বের একনিষ্ঠ রক্ষাকারী হিসেবে। 

ইতিহাসের এ হেন উপস্থাপনায় সম্পূর্নভাবে মুছে দেওয়া হল পাশবিক দমনের তথ্য, অকল্পনীয় গণহত্যা এবং ধর্ষণের কথা, মানুষের বাড়ি-সম্পত্তি লুঠের কথা এবং হাত পিছমোড়া করে বাঁধা নদীতে ভেসে যাওয়া অসংখ্য স্বাধীনতা সংগ্রামীর দেহের ছবি এবং তার কাহিনী। ইতিহাসের সেইসব জ্বলন্ত সত্যের জায়গা নিল কী ভাবে ভারতীয় সেনাবাহিনী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে তার পূর্বাঞ্চল দখল করেছিল, সেই গল্প।  এই বিকৃত ইতিহাসের পাতা থেকে স্বাভাবিকভাবেই বাদ দেওয়া হয়েছিল এই তথ্য যে, ভারতীয় সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপের ফলে শেষ পর্যন্ত বেঁচে গিয়েছিলেন আরও অসংখ্য ভীত, সন্ত্রস্ত সাধারণ মানুষ এবং স্বাধীনতা যোদ্ধা এবং প্রায় ধ্বংসের মুখ থেকে রক্ষা পেয়েছিল দেশ। ভারতের পক্ষ থেকে  সে দিনের নবজাতক রাষ্ট্রটিকে ক্রমাগত আর্থিক সহায়তা করে যাওয়ার কথা দূরের কথা, ভারতকে দেখানো হল একটি শিশু রাষ্ট্রের উপর ঝাঁপিয়ে পড়া হায়েনার রূপে।  এমন কি এ কথাও বলা হল, ১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর স্বাধীনতা পাওয়ার দু'দিন আগে ব্যাপক হারে যে বুদ্ধিজীবী নিধন ঘটেছিল, তা না কি করা হয়েছিল ভারতের নির্দেশে। 

মুক্তিযুদ্ধে জেনারেল জিয়াউর রহমানের ভূমিকাকে এমন ভাবে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানো হল যেন তিনিই দেশের স্বাধীনতার যুদ্ধের মূল সংগঠক, কান্ডারি। এই অতিশয়োক্তিকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল যে দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ধারণা জন্মায় জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা না করলে স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ জন্মই নিতে পারতনা। 

নতুন প্রজন্মের এই সব তরুণ, বিশেষত যারা ১৯৭১ সালের পর জন্মেছেন, যাঁরা দেখেননি তাঁদের পূর্বসূরীদের উপর চরম অত্যাচারের দৃশ্য, তাঁরা এই বিকৃত ইতিহাস পড়েই বেড়ে উঠেছেন এবং অজ্ঞ থেকে গিয়েছেন প্রকৃত সত্য সম্পর্কে। এই ধরণের মানুষেরা অজ্ঞতাবশত জামাতের মতিউর রহমান নিজামি,  দেলোয়ার হোসেন সাইদি এবং বি এন পি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মত   বহুনিন্দিত পাকিস্তানি সহযোগী, ধর্ষক এবং যুদ্ধাপরাধীদের     আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলার বদলে সংসদের সদস্য হিসেবে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছেন। এই সব যুদ্ধাপরাধীদের অনেকেই মন্ত্রীও হয়েছে, শহিদের রক্তে রাঙানো জাতীয় পতাকা লাগিয়ে দেশময় ঘুরে বেড়িয়েছে দেশের এইসব শত্রুদের গাড়ি।  

কিন্তু সব থেকে বড় কথা, যা সত্যি, তা চিরকালই সত্যি। এখনও  অসংখ্য মানুষ আছেন বাংলাদেশে, যাঁদের স্মৃতিতে সেদিনের নারকীয় বীভৎসতার স্মৃতি এখনও সমানভাবে জেগে আছে, অমলিন রয়েছে স্বাধীনতাসংগ্রামীঁদের বীরত্বগাথা। তাঁরা জানেন কী হয়েছিল সে দিন, কেমন করে শুরু হয়েছিল সংগ্রাম, কার কী ভূমিকা ছিল ! কারা সে দিন পাকিস্তানি হানাদারদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে দেশের মানুষের রক্তে হাত রাঙিয়েছিল, আবার পরে স্বাধীনতা পাওয়া সেই দেশেরই সর্বেসর্বা হয়ে উঠে পাকিস্তানের কাছে বিকিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্রে লিপত ছিল, তা-ও জানেন তাঁরা। 

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি নিরপেক্ষ এবং নৈর্ব্যাক্তিক ইতিহাস এবং একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য যে প্রক্রিয়া শুরু করেছে  বর্তমান সরকার-  সে দু'টি একে অপরের পরিপূরক।  কেন না একটি নিরপেক্ষ দলিল তৈরি হলে তবে তা বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ার ভিত্তি হয়ে উঠবে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের কাহিনী অবশেষে এখন ইতিহাসে ঠাই পেয়েছে। কে প্রথম স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন, তা  জানিয়ে দিয়েছে হাই কোর্ট - তিনি শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান নন। কিন্তু সব থেকে গুরুত্বপূর্ন দেশের মানুষ। তাঁরা সত্যি জানুন, অপরকে জানান। তীব্র বিরোধিতা করুন যাবতীয় মিথ্যার, চোখের মনির মত রক্ষা করুন সেই আদর্শকে, যাকে অবলম্বন করে ছেচল্লিশ বছর আগে পাকিস্তান ভেঙ্গে বেরিয়ে এসেছিল বাংলাদেশ। 




Video of the day
Ekattor tv News today 16 january 2018 Bangladesh Latest News Today News Update bd news all bangla
More Column News
Recent Photos and Videos

Web Statistics