Column
কিব্রিয়া হত্যা এবং কিছু তথ্য

29 Mar 2014

#

আওয়ামি লিগের বরিষ্ঠ নেতা এবং প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী এস এ এম এস কিব্রিয়াকে হত্যা করতে যে 'আর্জেস' গ্রেনেড ব্যবহার করেছিলে হরকত-উল-জিহাদ-আল-আনসারির উগ্রপন্থীরা, তা ভারতের কাশ্মীরে সক্রিয় লশকর-এ-তৈবা জঙ্গিদের জন্য চালান হতে যাওয়া অস্ত্র সম্ভার থেকে নেওয়া হয়েছিল বলে জানা গেছে।
সাধারণত যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত আর্জেস অত্যন্ত শক্তিশালী গ্রেনেড, যা একই সঙ্গে কাছাকাছি থাকা বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুর উপর মারাত্মক আঘাত হানতে পারে। 
           
প্রাক্তন কূটনীতিক কিব্রিয়া বাংলাদেশের মুক্তি যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় ওয়াশিংটন ডিসির পাকিস্তানি দূতাবাসে কাউন্সেলর ছিলেন। ১৯৭১ সালের ৪ঠা অগাস্ট দূতাবাসের চাকরি ছেড়ে দিয়ে প্রবাসে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশে সরকারের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেছিলেন তিনি।  ওয়াশিংটন ডিসিতে বাংলাদেশ দূতাবাস প্রতিষ্ঠা এবং বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তুলতেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছিলেন। 
 
কিব্রিয়া হত্যার তদন্ত করে ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট জানিয়েছে যে, পাকিস্তানে থাকা এল ই টি-র শীর্ষ নেতৃত্ব ঐ অস্ত্র সম্ভার বাংলাদেশে পাঠিয়েছিল সাতক্ষিরা সীমান্ত হয়ে কাশ্মীরে তাদের লোকেদের কাছে পৌঁছে দেবার জন্য। কিন্তু এর ঠিক আগেই পাচার হতে চলা এক দফা অস্ত্র ভারতের বর্ডার সিকিওরিটি ফোর্স ধরে ফেলেছিল বলে শেষ পর্যন্ত হুজি এই পরিকল্পনা রূপায়ন করতে পারেনি। 
 
পাকিস্তান থেকে পাওয়া এই ৩২টি আর্জেস গ্রেনেড পরবর্তীকালে বিভিন্ন বড় আক্রমণের ঘটনায় ব্যবহৃত হওয়ার আগে পর্যন্ত চট্টগ্রামেই রাখা ছিল। আওয়ামি লিগ নেত্রী শেখ হাসিনা (তখন বিরোধী নেত্রী), বাংলাদেশে প্রাক্তন ব্রিটিশ হাই কমিশনার আনোয়ার চৌধুরি, আওয়ামি লিগ নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, সইদা জেবুন্নেসা হক এবং সিলেটের মেয়র বদরুদ্দিন আহমেদ কামরানের উপর ব্যর্থ আক্রমণে  ব্যবহার করা হয়েছিল এই সব গ্রেনেড। ২০০৫ সালের ২৭শে জানুয়ারি হবিগঞ্জের বৈদ্যের বাজার এলাকায় কিব্রিয়ার চাঞ্চল্যকর হত্যাকান্ডের কয়েক বছর পর এই সব তথ্য সামনে আসে। 
 
কিব্রিয়া মামলায় দীর্ঘ শুনানির পর পরিকল্পিত ভাবে তদন্ত ভুল পথে চালানো হয়েছে, এই মত প্রকাশ করে ২০০৭ সালে  হাই কোর্ট থেকে আরও তদন্তের আদেশ দেওয়া হয়। নতুন তদন্তকারী অফিসার হিসেবে নিযুক্ত হন সি আই ডি-র এ এস পি রফিকুল ইসলাম। তদন্ত করে তিনি ঐ আক্রমণের ঘটনায় বিএনপি নেতা তথা প্রাক্তন মন্ত্রী লুতফোজ্জামান এবং হুজি কমান্ডার মুফতি হান্নানের জড়িত থাকার প্রমাণ পান এবং ২০১১ সালে ২০শে জুন তারিখে, অর্থাৎ ঘটনার ছ বছর বাদে আদালতে নতুন চার্জশিট পেশ করেন। উপযুক্ত প্রমাণের অভাবে এর আগে গ্রেপ্তার হওয়া দশ জন ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়া হয়। 
 
এর পর তদন্তের ফলে দশ জন চক্রান্তকারীকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়। তদন্তকারী অফিসার বলেছিলেন, "এখন আমরা জানি কারা বাংলাদেশে গ্রেনেড সরবরাহ করেছিল, আর কাদের হাতে সেগুলি এসেছিল।"
 
 
কাশ্মীরে সক্রিয় এল ই টি নেতা, জনৈক মোজাফ্‌ফর শা ২০০৪ সালের জানুয়ারি মাসে পাকিস্তানের করাচি থেকে জাহাজে করে ঐ গ্রেনেডগুলি চট্টগ্রামে পাঠিয়েছিল। মজিদ বাট এবং মৌলানা তাজুদ্দিনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল গ্রেনেডগুলি চট্টগ্রাম থেকে রাজধানী ঢাকায় পাঠানোর। 
 
 ইউসুফ বাট নামে নিজের পরিচয় দেওয়া মজিদ বাট ছিল এক জন পাকিস্তানি নাগরিক এবং কাশ্মী্র-কেন্দ্রিক জঙ্গি সংগঠন হিজব-উল-মুজাহিদিনের বড় মাপের নেতা। নিজের পরিচয় গোপন করতে বিভিন্ন নাম ব্যবহার করে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ছিল সে। বাট পাবনার বাসিন্দা এক জন বাংলাদেশি মহিলাকে বিয়ে করে ঢাকা সহ বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় বাস করেছিল । ঢাকায় ২০০৯ সালের ৭ই জানুয়ারি তারিখে আগ্নেয়াস্ত্র সহ ধরা পড়েছিল সে। তবে এক জন জঙ্গি হিসেবে তার পরিচয় জানা যায় কিব্রিয়া মামলায় তদন্ত চলার সময়।অন্যদিকে মৌলানা তাজুদ্দিনের পরিচয়, সে ২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত বিএনপি নেতা এবং প্রাক্তন উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুর  ছোট ভাই । এল ই টি-র বাংলাদেশ শাখার প্রধান মৌলানা তাজুদ্দিন ২০০৪ সালের ২১শে অগাস্ট তারখে শেখ হাসিনার উপর ব্যর্থ গ্রেনেড হানার পর পাকিস্তানে পালিয়ে গিয়েছিল।
 
 কাশ্মীরে জঙ্গি কাজকর্ম চালানোর ব্যাপারে পাকিস্তানে কেন্দ্র করে থাকা এল ই টি, এইচ ইউ এম এবং জইশ-এ-মহম্মদের মধ্যে একটি আঁতাত আছে। বাংলাদেশের মধ্যে দিয়ে কাশ্মীরে আগ্নেয়াস্ত্র, গুলি এবং বিস্ফোরক পাচারের ব্যাপারে সাহায্যকারীর কাজ করে এল ই টি। ২০০৩ সালের শেষের দিকে এই রকম একটি অস্ত্র এবং গোলাবারুদের চালানের চেষ্টা আটকে দিয়েছিল বিএসএফ। এই ঘটনায় হুজি নড়ে  যায় এবং তাদের কাজকর্ম অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই আবারও বিএসএফের হাতে ধরা পড়ার ভয়ে ৩২টি গ্রেনেড কাশ্মীরে পাঠানোর ঝুঁকি না নিয়ে হুজি সেগুলি চট্টগ্রামেই রেখে দিয়েছিল। এইচ ইউ এম সদস্য মজিদ বাটের সহযোগিতায় বাংলাদেশে গ্রেনেডগুলি এনেছিল মৌলানা তাজুদ্দিন।
 
বিপুলের নির্দেশমত জনৈক নঈম আহমেদ আরিফ, ওরফে লিমু কিব্রিয়াকে হত্যা করতে ওই গ্রেনেডটি দেয় বদরুল আলম মিজানকে। কিব্রিয়ার উপর আক্রমণের সময় মিজানের সঙ্গে ছিল মিজানুর রহমান মিঠু, মোহাম্মদ আলি এবং মোহাম্মদ বদরুল। দু\'টি দলে ভাগ হয়ে গিয়ে মিজান এবং মোহাম্মদ আলি ছিল মোটর সাইকেকের সওয়ার হয়ে, আর অন্য দু\'জন একটি অটো রিকশা নিয়ে পৌঁছোয় বৈদ্যের বাজারে, যেখানে স্থানীয় এম পি কিব্রিয়া একটি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। 
 
 
 
 গ্রেনেডটি ছোঁড়ার ভার ছিল মোহাম্মদ আলির উপর, কিন্তু আসল সময়ে সে ঘাবড়ে যায় এবং মিজানকে বলে কাজটি করতে। বিস্ফোরকের ব্যাপারে প্রশিক্ষিত মিজান  অবশ্য   কাজটি সফলভাবেই করে। হত্যার উদ্দেশ্য নিয়ে বলতে গিয়ে তদন্তকারীরা গ্রেপ্তার হওয়া হুজি নেতা মুফতি আবদুল হান্নানকে উদ্ধৃত করে বলেছেন, হুজির সর্ব্বোচ্চ নীতি নির্ধারন কমিটি, মজলিশ-এ-সুরার মত এই যে, আওয়া্মি লিগ একটি ইসলাম-বিরোধী এবং ভারতপন্থি  রাজনৈতিক দল এবং তাই সেই দলের নেতাদের খতম করা দরকার। 
 
 
বি এন পি এবং জামাত-এ-ইসলামির অনেক নেতাই হুজির এই পরিকল্পনার কথা জানতেন। তার বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে তাঁরা চুপ থেকে হুজিকে তাদের প্ল্যানমাফিক কাজ করতে উৎসাহিতই করলেন। তদন্ত চলাকালে এইরকম অনেকের কথা জানা গেলেও বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের প্রাক্তন রাষ্ট্র মন্ত্রী লুৎফোজ্জামান বাবরই তাঁদের মধ্যে একমাত্র, যিনি কিব্রিয়া হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছেন। 
 
 
"এই ঘটনায় বাবর সম্পর্কে এ\' পর্যন্ত আমরা যা জানতে পেরেছি তা হল, তিনি মৌলানা তাজুদ্দিনকে পাকিস্তানে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছিলেন," তদন্তকারী সি আই ডি অফিসার রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন। দু\' হাজার পাঁচ সালে ডিরেকটরেট জেনারেল অফ ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্সের হাতে আটক হওয়ার পর তাজুদ্দিন হুজি-পরিচালিত সমস্ত আক্রমণ এবং সেই সঙ্গে অস্ত্র ও বিস্ফোরক জোগাড় এবং পাচার-সম্পর্কিত খবরাখবরগুলি দেয়। ডি যে এফ আই এ\' সবই বাবরসহ তৎকালীন সরকারের কর্তাব্যক্তিদের জানায়। কিন্তু তাজুদ্দিনের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ না নিয়ে বাবর তাকে বরং নিরাপদে পাকিস্তানে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেন। "স্বরাষ্ট্র দপ্তরের রাষ্ট্র মন্ত্রী হয়েও বাবর তাজুদ্দিনকে পালাতে সাহায্য করেন এবং তদন্তের মুখ ঘুরিয়ে দেন। আমরা এখন দেখছি, তাঁর যে ভূমিকা, তাতে সরকারিভাবে তাঁকে চার্জশিটে অভিযুক্ত হিসেবে রাখা যায় কিনা," তদন্তকারী অফিসার জানিয়েছেন।
 
কিব্রিয়ার স্ত্রী আশমা কিব্রিয়া বলেছেন, তদন্তে কী উঠে আসছে, সে ব্যাপারে তাঁর কোনও ধারনা নেই। "যা জানি, তা খবরের কাগজ থেকেই জানি। তবে আমি খুশি নই, কারন আওয়ামি লিগ সরকার এই তদন্ত আরও তাড়াতাড়ি শেষ করতে পারতেন। আমরা হতাশ।যে দলে আমার স্বামী কাজ করেছেন, তারা এখন ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও যদি হত্যাকারীদের শাস্তি দিতে না পারে, তবে ভবিষ্যতেও সুবিচারের বিন্দুমাত্র আশা আমি দেখছিনা," আশমা জানিয়েছেন।
 
 



Video of the day
Recent Photos and Videos

Web Statistics