Column
সুবিচারের অপেক্ষায় দীর্ঘকাল

10 Oct 2014

#

২০১৩ সালের ৩রা নভেম্বর তারিখে ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল ২ ১৯৭১ সালের গণহত্যার দুই নায়ক, আল বদরের অপারেশনস ইন-চার্জ চৌধুরি মুইনুদ্দিন এবং প্রধান ঘাতক আশফারুজ্জামান খানের মৃত্যুদন্ড ঘোষণা করেছিল।

 বাংলাদেশে  যে কোনও  যুদ্ধাপরাধ মামলার ক্ষেত্রে চৌধুরি মুইনুদ্দিন এবং আশফারুজ্জামানের রায়ই এখন পর্যন্ত শেষতম।   তারপর থেকে চলছে নীরবতা।              

 

যুদ্ধাপরাধ বিচারে প্রথম সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তি দু\' বছর ধরে পালিয়ে থাকা আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকার। ২০১৩ সালের জানুয়ারি মাসে ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদন্ড দেয়। 


আই সি টি-১ এর পর যুদ্ধাপরাধ অভিযুক্ত  ২০১৩ সালের ১লা অক্টোবর সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরিকে চরম দন্ড এবং এবং ৯ই অক্টোবর আবুল আলিমকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয় ।


অশিষ্ট-ইতর দুর্নামে কুখ্যাত  বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরি ১৯৭১ সালে যে সব ভয়ানক অপরাধ করেছিলেন, তার জন্য কখনওই কোনও রকমের অনুশোচনা প্রকাশ করেননি। বিচার ব্যবস্থার যেন কোনই মূল্য নেই তাঁর কাছে। বার বার তিনি আদালতের শিষ্টাচার বিধি ভেঙ্গে বিচারক এবং কৌঁসুলিদের উদ্দেশ্যে বিদ্রুপের হাসি হেসেছেন। বর্তমান সরকারের বদল হবে এবং তিনিও মুক্ত হবেন, এই বিশ্বাস এই বিএনপি নেতার মধ্যে এতটাই ছিল যে, এমন কি তিনি কৌঁসুলি সহ বিচারের সঙ্গে যুক্ত সবাইকেই ভবিষ্যতে হিসেব বুঝে নেওয়ার জন্য খাতায় নাম তুলে রাখার হুমকি দিয়েছেন। আদালতে বিচারকরা যখন চৌধুরির মৃত্যুদন্ড পড়ে শোনাচ্ছিলেন, এই উদ্ধত বিএনপি নেতা তখন তাঁদের উদ্দেশ্যে বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য ছুঁড়ে দিয়েছেন।


যুদ্ধাপরাধ বিচারে দোষী সাব্যস্ত তিন জন --আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকার, চৌধুরি মইনুদ্দিন এবং আশরাফুজ্জামান খানকে তাদের অনুপুস্থিতিতেই মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়েছে। এরা সবাই পালিয়ে রয়েছে।


২০১৩ সালের ৩রা নভেম্বর চৌধুরি মইনুদ্দিন এবং আশরাফুজ্জামানের ফাঁসির হুকুমের পর থেকেই দেশের এবং দেশের বাইরের সমস্ত মানুষই বাকি যুদ্ধাপরাধ মামলাগুলির রায় ঘোষণার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন।



২০১৪ সালের ২৪শে জুন জামাত প্রধান এবং যুদ্ধাপরাধের পান্ডা মতিউর রহমান নিজামির মামলার রায় দানের কথা ছিল ট্রাইব্যুনালের।কিন্তু অসুস্থতার কারণ দর্শিয়ে জেল কর্তৃপক্ষ তাকে  আদালতে হাজির না করায় সেই রায় দান স্থগিত রাখা হয়। বিএনপি-র নেতৃত্বাধীন চার দলের জোট সরকারের প্রাক্তন ক্যাবিনেট মন্ত্রী নিজামির বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রাম চলার সময় গণহত্যা এবং গণধর্ষণ সহ ১৬ দফা অভিযোগ আনা হয়েছে। রায় স্থগিত রাখার পরের দিনই নিজামি \'সুস্থ\' হয়ে ওঠেন এবং এখন তিনি আদালতে এসে ট্রাইব্যুনালের রায় শুনতে সম্পূর্ন সক্ষম। কিন্তু অজানা কোনও কারনে রায় দিতে বিলম্ব করছে ট্রাইব্যুনাল।



এর আগেও দু\'বার নিজামি মামলার রায় ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে-প্রথম বার-২০১৩ সালের ১৩ নভেম্বর, শুনানি শেষ হবার পর এবং দ্বিতীয়বার- ২০১৪ সালের ২৪শে মার্চ, নতুন করে সওয়াল-জবাব শুনানির পর। অজ্ঞাত কোনও কারণে নিজামি মামলার রায় কেবল পিছিয়েই যাচ্ছে।


বিএনপি নেতা জাহিদ হোসেন খোকনের বিরুদ্ধে আনা মামলার শুনানি ২০১৪ সালের ১৭ই এপ্রিল তারিখে শেষ হয়ে গেলেও ট্রাইব্যুনাল তার রায় এখনও দেয়নি। 


একই ভাবে, আওয়ামি লিগের প্রাক্তন নেতা মোবারক হোসেনের বিরুদ্ধে চলা মামলাটির রায়ও ঝুলিয়ে রেখেছে আইটিসি-১। এর আগে, জামাত নেতা মির কাশেম আলির ৪ঠা মে তারিখে শেষ হয়ে গেলেও তার রায় এখনও দেয়নি  আইটিসি-২।


জাতীয় পার্টির নেতা সইদ মহম্মদ কায়সারের বিরুদ্ধে আনা যুদ্ধাপরাধ মামলাটির শুনানিও সম্পূর্ন হয়েছে আইটিসি-২-এর আদালতে। রায় দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে বিচার সম্পূর্ন হবার আগেই পরিচিত যুদ্ধাপরাধী এবং জামাত নেতা এ কে এম ইউসুফের সম্প্রতি মৃত্যু হয়েছে ঢাকার একটি হাসপাতালে।


ইতিমধ্যে জামাতের অ্যাসিস্টান্ট  সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলামের মামলাটির শুনানি শেষ হয়ে গেল গত ১৮ই সেপ্টেম্বর। তবে তার রায় দান এখনও হয়নি। জামাত নেতা আবদুস সোভানের বিরুদ্ধে চলা অন্য একটি মামলার শুনানি অল্প দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে এবং এ ক্ষেত্রেও রায় সম্ভবত ঝুলিয়ে রাখাই হবে।


যুদ্ধাপরাধ মামলাগুলিতে রায় ঘোষণার এই অতি মন্থর প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন শ্রেনীর মানুষ হতাশ। সারা বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধ সংক্রান্ত মোট ৫৭৭টি মামলা রুজু করা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে অনেকে অভিযুক্ত, প্রমাণিত দোষী ব্যক্তি এবং অনেক অত্যাচারিত বিচারপ্রার্থীর মৃত্যু হয়েছে। চার দশক ধরে অপেক্ষার পর ২০১০ সালে শুরু করা হয়েছিল যুদ্ধাপরাধ বিচারের প্রক্রিয়া। রায় ঘোষণা হয়নি, এ রকম মামলার তালিকা এখন বেশ দীর্ঘ। কী কারনে এখনও এই মামলাগুলির রায় দেওয়া গেলনা, তা সত্যিই রহস্যাবৃত।এই সম মামলার সরকারি কৌঁসুলিরাও জানতে চান কেন ট্রাইব্যুনাল নীরব, কেন রায় দানে অযথা দেরী করা হচ্ছে।  


"মানুষ আর কত দিন অপেক্ষা করবে? তারা রায় জানতে চায়," গণজাগরন মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার বলেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতালাভ রুখতে যে জামাত ১৯৭১ সালে সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলেছিল, তাদের প্রতি \'আপোসমূলক\' মনোভাব নেওয়ার জন্য সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন তিনি।"বাংলাদেশের মানুষ এ জিনিষ মেনে নেবেননা," তিনি বলেছেন।



ইতিমধ্যে,যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল দেলওয়ার হোসেন সাইদিকে যে মৃত্যুদন্ড দিয়েছিল, তার বিরুদ্ধে আনা আবেদন মঞ্জুর করে গত ১৭ই সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্ট ঐ জামাত নেতার যাবজ্জীবন কারাবাসের আদেশ দিয়েছে। সর্বোচ্চ বিচারালয়ের এই রায়  সরকারের কাছে একটি বড় বিস্ময়ের ব্যাপার।


সাইদিকে \'নারী নির্যাতনকারী\' আখ্যা দিয়ে বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম জানিয়েছেন, তিনি এই রায়ে অখুশি এবং তাঁর আশা ছিল যে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঘোষিত যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের চরম দন্ডের রায়ই বহাল রাখবে সর্বোচ্চ আদালত।


তাঁর মন্তব্য, যদিও এ কথা সন্দেহাতীত ভাবে প্রমাণিত যে, স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় খুনে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে সাইদি নারী ধর্ষণে অংশ নিয়েছিলেন এবং হিন্দুদের জোর করে ধর্মান্তরিত করেছিলেন, তবুও সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারে সুপ্রিম কোর্টের অ্যাপেলেট ডিভিশন মৃত্যুদন্ডের শাস্তি লাঘব করে যাবজ্জীবনের আদেশ দিয়েছেন। ব্যাপারটি সত্যিই আশ্চর্যজনক।


এর আগে, ২০১৩ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর জামাত নেতা এবং যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত আবদুল কাদের মোল্লাকে মৃত্যুদন্ড দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। ২০১৩ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি হত্যা, ধর্ষণ এবং অন্যান্য জঘন্য অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে মোল্লার যাবজ্জীবন কারাবাসের হুকুম দিয়েছিল আইসিটি-২। ট্রাইব্যুনালের এই রায়কে \'অতি লঘু এবং কৃত কুকর্মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ন নয়\' বলে বর্ননা করে সরকার পক্ষ থেকে পুনর্বিচারের জন্য সুপ্রিম কোর্টের কাছে আপীল করা হয়েছিল। আপীল সাড়া দিয়ে সেই রায় উলটে দিয়ে মোল্লার ফাঁসির আদেশই দিয়েছিল সর্বোচ্চ আদালত।


এই মূহুর্তে চার জন যুদ্ধাপরাধ আসামীর ভাগ্য সুপ্রিম কোর্টে ঝুলছে। ট্রাইব্যুনালে তাদের শাস্তির আদেশের বিরুদ্ধে এরা সবাই সর্বোচ্চ বিচারালয়ে আপীল করেছে। এর হলঃ জামাতের প্রাক্তন প্রধান গুলাম আজম, জামাত নেতা আলি আহসান মহম্মদ মোজাহিদ এবং মুহাম্মদ কামারুজ্জামান এবং বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরি। এদের মধ্যে গুলাম আজমের ৯০ বছরের কারাবাসের শাস্তি হয়েছে এবং বাকি সকলেই মৃত্যুদন্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত।


ওয়ার ক্রাইমস ট্রাইব্যুনালে রায় দানের পরেও যুদ্ধাপরাধ মামলাগুলি ক্রমেই সুপ্রিম কোর্টের অ্যাপেলান্ট ডিভিশনে জমছে। মনে করা হচ্ছে, এই সব মামলাগুলির রায় ঘোষণা হতে হতে কয়েক দশক লেগে যাবে। তা হলে যুদ্ধাপরাধ বিচারের মূল উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হবে। তাঁদের জীবদ্দশায় যদি চূড়ান্ত রায় না শুনতে পান, বিচারপ্রার্থীরা তা হলে হতাশ হবেন। 


যুদ্ধাপরাধ সংক্রান্ত মামলাগুলির দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়া দরকার এই কারনে যে, এ ব্যাপারে জাতীয় স্তরে জনসাধারণের মধ্যে একটি ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। যুদ্ধাপরাধ বিচারের জন্য সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তে যে উৎসাহ তৈরি হয়েছিল মানুষের মধ্যে, তা এখন স্তিমিত এবং কিছু অগ্রগতি সত্ত্বেও অদূর ভবিষ্যতে বিচার সম্পূর্ন হওয়ার আশা ক্রমশই ক্ষীয়মাণ। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার পর যা হয়েছিল, তেমন ভাবেই সরকার পরিবর্তন হলেই এই বিচার প্রক্রিয়াও বাতিল হয়ে যাবে।


১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের উপর অত্যাচারের জন্য দায়ী পাকিস্তানের সহযোগী ইসলামিক শক্তিগুলি ক্রমেই আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠছে এই ভেবে যে, সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই বিচার প্রক্রিয়াও বন্ধ হয়ে যাবে।


"খুব শিগগিরি এই দিনগুলির শেষ হবে। শুধু খালেদা জিয়া নন,এখন যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত, জেলে থাকা জামাত নেতারাও তখন আবার মন্ত্রী হবেন," জামাতের ছাত্র সংগঠন ইসলামি ছাত্র শিবিরের কর্মী, জনৈক আনোয়ারুল আজমের মন্তব্য। স্বাধীনতা বিরোধী, পাক সহযোগীরা বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে, যুদ্ধাপরাধ বিচার অর্ধসমাপ্ত রেখেই বিদায় নেব শেখ হাসিনা সরকার, আর জামাত সহ অন্যান্য মিত্র দলগুলিকে সঙ্গে নিয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার আরও এক বার ঠান্ডা ঘরে পাঠিয়ে দেবে যুদ্ধাপরাধ বিচারের প্রক্রিয়াকে।




Video of the day
More Column News
Recent Photos and Videos

Web Statistics