Column
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঝঞ্ঝা ও সাম্প্রতিক ঘটনাবলী

30 Mar 2015

#

জানুয়ারি মাসের ৬ তারিখ থেকে বিএনপি-নেতৃত্বাধীন বিরোধীরা অনির্দিষ্ট কালের জন্য যে অবরোধ চালিয়ে যাচ্ছে, তাতে এ পর্যন্ত অন্তত ১৪০ জন নিহত হয়েছেন, যাঁদের মধ্যে পেট্রোল বোমা আক্রমণের শিকার ৬৬ জন।

 এই তালিকায় এর মধ্যে হয়তো আরও কিছু ব্যক্তি যুক্ত হয়েছেন। এই রাজনৈতিক টালমাটাল এবং মৃত্যুর মিছিল যে আগামি কয়েক সপ্তাহের মধ্যে বন্ধ হবে, এমন কোনও সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছেনা। ১৩ই মার্চ ঢাকায় একটি সাংবাদিক সম্মেলনে  যে কোনও মূল্যে সরকারের পতন ঘটানোর উদ্দেশ্যে এই অবিরাম অবরোধ এবং হরতাল চালিয়ে যাওয়ার সংকল্পের কথা ঘোষণা করেছেন বিএনপি-র চেয়ারপার্সন  খালেদা জিয়া।


অবরোধ-হরতালের পক্ষে জনগণের সমর্থন অথবা সহানুভূতি আদায় করতে না পেরে বিএনপি এখন আগুনে বোমা ছুঁড়ে, গুন্ডামি করে আর নির্বিচার হত্যালীলা চালিয়ে আতঙ্কিত করে তুলতে চাইছে মানুষকে। মানুষের জীবন ও সম্পত্তি রক্ষা করতে নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করতে হয়েছে সরকারকে।

ফেব্রুয়ারি মাসের ২৫ তারিখে সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এই অবরোধ-হরতালের ফলে দেশের ১.৩ ট্রিলিয়ন টাকার (প্রায় ১৫.৫ বিলিয়ন ডলার) ক্ষতি হয়েছে। ফেডারেশন অফ বাংলাদেশ চেম্বার্স অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির হিসেব অনুযায়ী দৈনিক ক্ষতির পরিমাণ ১৫০০ থেকে ২০০০ কোটি টাকা। তৈরি পোশাক শিল্পের মত জাতীয় অর্থনীতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে ৮৪৩ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে প্রতিদিন। পরিবহণে এই ক্ষতি দৈনিক ৩০০ কোটি টাকা, কৃষিতে ২৮০ কোটি টাকা এবং  পর্যটনে ২০০ কোটি টাকা। 

২০০৮-০৯ সাল থেকে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ক্রমাগত এগিয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয়, যা ২০০৭ সালে  ছিল ৩.৭৪ বিলিয়ন ডলার, ২০০৮ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৫.৮ বিলিয়ন ডলারে। ব্যাংক অফ বাংলাদেশের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয়ের পরিমাণ ২০১১ সালেই ১২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। বর্তমান সরকারের আমলে বৈদেশিক সাহায্য এবং আমদানির উপর দেশের নির্ভরতা ক্রমাগত কমেছে। ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং প্রতিকূল আবহাওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের শ্রমনিবিড় কৃষি ক্ষেত্রে খাদ্যশষ্য উৎপাদনের পরিমাণ ক্রমাগত বেড়েছে।  বাংলাদেশ থেকে মোট রপ্তানি, যার বাৎসরিক অর্থমূল্য ২৭ বিলিয়ন ডলার, তার ৮০ শতাংশই আসে বস্ত্রশিল্প থেকে (২১.৫ বিলিয়ন ডলার)। আওয়ামি লিগ সরকারের আমলে বস্ত্র উৎপাদনে বাংলাদেশ পৃথিবীর মধ্য দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে, চিনের পরেই। 

বর্তমান সরকারের আমলে যে সব উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে দেশ, তা সবই মুছে যাওয়ার বিপদ দেখা দিয়েছে এখন। 

যে কোনও নিরপেক্ষ বিচারেই দেখা যাবে  বর্তমানের এই আন্দোলনের চালিকা শক্তি বিএনপির সংকীর্ন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য- যে কোনও ঊপায়ে ক্ষমতা থেকে সরে যেতে সরকারকে বাধ্য করা। এই ভাবে ঘোলা জলে মাছ ধরে বিএনপি তাহলে আবার ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারবে।  

বিএনপি-র হিসেবের মধ্যে এর পরে যা আছে, তা হল,   যে মূহুর্তে বর্তমান সরকার পড়ে যাবে, সেই মূহুর্তে দলের সর্বোচ্চ নেত্রী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে থাকা দূর্নীতি মামলা তুলে নিয়ে তাঁকে বিপন্মুক্ত করা যাবে। একই ব্যাপার প্রযোজ্য হবে বিদেশে পালিয়ে থাকা তাঁর ছেলে তারিক রহমানের ক্ষেত্রেও।  এ ছাড়াও বিএনপি-মিত্র মৌলবাদী এবং পাকিস্তানপন্থি জামাতের যে সব নেতা ১৯৭১-এর যুদ্ধাপরাধে দন্ডিত হয়েছেন, তাঁদের সবাইকেই জেল থেকে মুক্ত করে আনা সম্ভব হবে বর্তমান সরকার পড়ে গেলে। 

কী কারনে এই অরাজকতা সৃষ্টি করার পথে গেল বিএনপি, যার পরিণাম শুধুই মৃত্যু, সম্পত্তির ধ্বংস এবং দেশের অর্থনৈতিক অধোগতি? এটা কি কোনও রাজনৈতিক অথবা গণতান্ত্রিক আন্দোলন ?

২০১৪ সালে উপর্যুপরি দ্বিতীয়বার নির্বাচনে জয়লাভ করে পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতায় এসেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কারচুপি করা হবে, এই অভিযোগ তুলে নির্বাচন বয়কট করেছিল খালেদা জিয়ার বিএনপি। সেই থেকেই এই সরকাকে \'অবৈধ\' বলে  নিরপেক্ষ তদারকী সরকারের অধীনে নতুন করে নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছে তারা।  সরকার অবশ্য এই অবস্থানেই অনড় আছে যে, পরবর্তী নির্বাচন যখন হওয়ার কথা, তখন, অর্থাৎ ২০১৯ সালেই হবে, তার আগে নয়।  ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে কূটনীতি, বৈদেশিক লগ্নী আকর্ষণ, পদ্মা-ব্রিজ নির্মাণ এবং একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করার ব্যাপার উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব দেখিয়েছে শেখ হাসিনার সরকার। দৃঢ় হাতে দেশের হাল ধরে থেকে বিএনপি এবং তাদের মিত্রদের তান্ডবে রসাতলে যেতে বসা দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন শেখ হাসিনা। মানুষ প্রসন্ন হয়েছেন, যখন দেখেছেন জামাত নেতা আবদুল কাদের মোল্লা, মতিউর রহমান নিজামি, মুজাহিদ, কামরুজ্জামান এবং মির কাশিমা আলির মত পরিচিত বেশ কিছু যুদ্ধাপরাধীর দন্ডাদেশ ঘোষিত হয়েছে তাদের অতীত কৃতকর্মের জন্য।

এই সব কারনেই  শেখ হাসিনা এবং  তাঁর সরকারের নীতি মানুষের সমর্থন পাবে। সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে তাঁর অচঞ্চল অবস্থান, দেশের উন্নয়নের ব্যাপারে  একাগ্র মনোযোগ, কৃষি, শিক্ষা, নারী-ক্ষমতায়ন এবং দেশের ক্রমাগত অর্থনৈতিক উন্নতির ফলেই এই সরকারের পিছনে আজ জনসমর্থন দৃঢ় হয়েছে। সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে ২০১৪ সালে পে কমিশন উন্নত বেতন এবং ভাতা সুপারিশ করেছে আর শিক্ষা ক্ষেত্রে সরকার থেকে সারা দেশের স্কুল পড়ুয়াদের মধ্যে৩২ কোটি পাঠ্য বই বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে।

দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতি ঘটাতে আজ পর্যন্ত কোনও কর্মসূচী ঘোষণা করেনি বিএনপি এবং তার জোটসঙ্গীরা। তান্ডবকারীদের রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি করে সরকারের পতন ঘটানোই এদের একমাত্র লক্ষ্য। এই দলগুলি  মুখে গণতন্ত্রের কথা বলছে, কিন্তু  ক্ষমতায় থাকার সময় এরা নিজেরা  গণতান্ত্রিক রীতিনীতি্র প্রতি কেমন সন্মান দিয়েছিল, এ কথা সবারই জানা। 

যে সব উদ্দেশ্য নিয়ে খালেদা জিয়া আওয়ামি লিগ সরকারের বিরুদ্ধে কুৎসা চালাচ্ছেন, তার অন্যতম হল, ১৯৭১-এর যুদ্ধাপরাধ সংক্রান্ত ব্যাপারে তাঁর মিত্র দল জামাতের নেতাদের বিচার বন্ধ করা। দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক ভাবে এবং শুভানুধ্যায়ী হিসেবে তিনি নিজে এক সময় তাঁর দলের সঙ্গে দেশের ক্ষমতা ভাগাভাগি করে নেওয়া জামাতের যুদ্ধাপরাধী এবং পাকিস্তানের সহযোগীদের এক জন বড় সমর্থক। নিজে দেশের প্রধানমন্ত্রী থাকার সময় রাষ্ট্রের জনক শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকারীদের এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতা করা পাকিস্তানপন্থীদের বিচারের  যে কোনও উদ্যোগের সম্ভাবনা নষ্ট করতে  যা করার দরকার তার সব কিছুই করেছিলেন তিনি। 

বর্তমান পরিস্থিতিতে অবশ্য দেশের মানুষ ক্রুদ্ধ হবে বলে এই সব দেশ-বিরোধী শক্তিদের প্রকাশ্যে সমর্থন জানাতে পারছেন না তিনি। কারন মানুষ ভীষণ ভাবে চাইছেন যাতে এই সব যুদ্ধাপরাধী, দেশ বিরোধী পাকিস্তানপন্থীদের যথাযথ বিচার এবং শাস্তি হয়। মানুষের দৃষ্টি, চেতনা, স্মৃতি আবছা হয়ে যায়নি। তাই খালেদা জিয়ার পায়ের তলা থেকে দ্রুতই মাটি সরে যাচ্ছে। নিজে কোথায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন, তা এক বার ফিরে দেখুন তিনি। অবরোধ আর হরতালের নামে নিরীহ মানুষদের জীবন্ত জ্বালিয়ে হত্যা করার যে পথে তিনি চলছেন, ইতিমধ্যেই তার অনেক মূল্য দিতে হয়েছে তাঁকে। 

যত দিন না বিএনপি উন্নততর কোনও প্রশাসনিক পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করছে এবং ছিন্ন করছে পাকিস্তানপন্থী, দেশবিরোধীদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক, ততদিন গণতন্ত্রের নামে খালেদা জিয়ার কুম্ভীরাশ্রুতে মানুষ ভুলছেন না। 

কোনও দিনই বিএনপির-র কোনও পরিচ্ছন্ন অতীত ছিলনা। স্বাধীনতা বিরোধী এবং পাকিস্তানপন্থী শক্তিদের সঙ্গে তাদের গভীর সখ্যতার ফলে আজ দেশে চরমপন্থী দলগুলি মাথা চাড়া দিয়ে উঠে দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ক্ষেত্রে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। 

অন্য দিকে, ১৯৪৯ সালে তাদের জন্মের সময় থেকেই বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক-ভাষাভিত্তিক রাজনীতির পুরোধা হিসেবে কাজ করে এসেছে আওয়ামি লিগ। অনেক সীমাবদ্ধতা এবং ত্রুটি সত্ত্বেও  যথেষ্ট পরিমাণে গণতন্ত্র থাকা একটি উদার, মুসলমান-প্রধান  রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের বেড়ে ওঠার পিছনে এই দলটি অবদান রয়েছে। সামরিক বাহিনী, সংবাদমাধ্যম এবং ব্যবসা ক্ষেত্রে অতি সীমাবদ্ধ প্রভাব সত্ত্বেও এখনও আওয়ামি লিগ দেশের আম জনতার সার্বিক সমর্থন পেয়ে চলেছে। শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহ্যবাহী, বাংলাদেশ সৃষ্টির অন্যতম বৃহৎ অংশীদার এই দলটির একটি অনন্য পরিচিতি তৈরি হয়েছে।




Video of the day
Recent Photos and Videos

Web Statistics