Column
ফিরে এসেছে আত্মঘাতী জঙ্গিরা

01 Jan 2016

#

২৫শে ডিসেম্বর আহমেদিয়া মসজিদে শুক্রবারের প্রার্থনা চলার সময় জামায়েতুল বাংলাদেশ (জে এম বি)-এর এক আত্মঘাতী জঙ্গি্র ঘটানো বিস্ফোরণে সে নিজে মারা যায় এবং গুরুতর ভাবে আহত হন ২৫ জন। এই বিস্ফোরণের ঘটনাটি ঘটে ঢাকা থেকে ২৫০ কিমি উত্তর-পশ্চিমে, বাঘমারাতে। স্থানীয় থানার অফিসার-ইন-চার্জ মতিউর রহমান জানিয়েছেন, মৃত ব্যক্তির দেহের ক্ষতের ধরণ থেকে মনে হয় সে আত্মঘাতী হামলাই ঘটাতে এসেছিল।

বাংলাদেশের ১০,০০০ মানুষের আহমেদিয়া সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি সংস্থা আহমেদিয়া মুসলিম জামাত বাংলাদেশের সেক্রেটারি আবদুস সামাদ বলেছেন, ঐ জঙ্গির সঙ্গে আরও এক ব্যক্তি ছিল, যে ঘটনার পর চুড়ান্ত বিশৃংখলার মধ্যে পালিয়ে যায়।

 

শায়কের বক্তব্যে আরও প্রকাশ যে, বিএনপি এবং জামাতের কিছু প্রাক্তন মন্ত্রী এবং এমপি জে এম বি-র মদতদাতা। প্রাক্তন বাণিজ্যমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরি, প্রাক্তন উপমন্ত্রী রাহুল কুদ্দুস তালুকদার এবং জামাতের প্রধান এবং প্রাক্তন শিল্পমন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামি (যুদ্ধাপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে এখন ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত) সহ জামাতের বেশ কিছু নেতার নাম বিশেষভাবে করে সে। এই সব নেতাদের অথবা তাঁদের দলের থেকে এ বিষয়ে কোনও উত্তর পাওয়া যায়নি।
পরে, ২৭শে ডিসেম্বর, তিন জন জে এম বি জঙ্গিকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনার মহম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেছেন, জে এম বি-র একটি ডেরায় হানা দিয়ে পুলিশ একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এম কে ১১ সেমি অটোমেটিক স্নাইপার রাইফেল, পাঁচ কিলো এক্সপ্লোসিভ জেল, ১৩ টি সামরিক উর্দি, ২৫২ রাউন্ড বুলেট, ২৫ টি ডিটোনেটর, সামরিক বাহিনীর মেজর পদের কয়েক জোড়া ব্যাজ এবং বিপুল পরিমাণের বিস্ফারক ও গ্রেনেড উদ্ধার করেছে। এ ছাড়া সেখান থেকে একটি সুইসাইড ভেস্ট,  যোগাযোগের যন্ত্র এবং জিহাদি পত্রিকাও পেয়েছে ।

 

এই গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটে  ঢাকার মিরপুর এলাকায় এই নিষিদ্ধ সংগঠনের গোপন ডেরায় হানা দিয়ে পুলিশ প্রচুর বিস্ফোরক এবং গ্রেনেড সহ সাত জে এম বি সদস্যকে গ্রেপ্তার করার পরে। আল কায়দা-প্রধান জাওয়াহিরি দক্ষিন এশিয়ায় এই সন্ত্রাসবাদী গোষ্টীর শাখা গঠনের ঘোষণা করার পরেই জে এম বি-র কার্যকলাপ  বেড়ে যায়।

 

নিরাপত্তা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মেজর জেনারেল (অবঃ) আবদুর রশিদের বক্তব্য, "একটি সন্ত্রাসবাদী দলের কাছ থেকে সুইসাইড ভেস্ট পাওয়া গেলে বুঝতে হবে যে আক্রমণে যাতে আরও বেশি জীবনহানি হয়, তারই প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা।"

 

২০১৪ সালে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের বিস্ফোরণে জড়িত ছিল জে এম বি। বর্ধমান বিস্ফোরণের মূল চক্রী, জে এম বি-প্রধান শেখ রেহমতুল্লা ভারত এবং রহিঙ্গিয়া মুসলমান অধ্যুষিত পশ্চিম মায়ানমারের রাখাইন প্রদেশে এই উগ্রপন্থী সংগঠনের জাল বিস্তার করার পরিকল্পনার কথা প্রকাশ করেছে। এই পরিকল্পনার পিছনে একমাত্র উদ্দেশ্য, 'গ্রেটার ইসলামিক বাংলাদেশ' গঠন করা।

 

রশিদ বলেন, বাংলাদেশে্র ভৌগলিক অবস্থান এমনই যে,  আফগানিস্তানে তালিবান যে রকম করেছিল, সে রকম ভাবে জিহাদের মাধ্যমে এ দেশে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করা অসম্ভব। এর কারণ, বাংলাদেশের তিন দিক ঘিরে রয়েছে ভারত এবং তার এক দিকে সমুদ্র। আফগানিস্তানে তালিবান যা করেছিল, সে ভাবে জিহাদ সফল করতে হলে বাংলাদেশ-লাগোয়া দেশগুলি থকে জে এম বি-র সাহায্য এবং সে সব জায়গায় কিছু ঘাঁটি থাকা দরকার। তিনি বলেন আফগানিস্তানে যে তালিবান অভ্যুদয় সফল হয়েছিল, তার কারণ ছিল পাকিস্তানের সাহায্য।

 

আহমেদিয়া মসজিদের বিস্ফোরণ এমন সময় ঘটানো হল, যখন অ-সুন্নি এবং  অমুসলিম সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তু করে ইসলামি হিংসা বেড়ে চলায় উদ্বিগ্ন সব মহল। অক্টোবর মাসে  ঢাকায় শিয়াদের একটি ধর্মীয় মিছিলের উপর বোমা-আক্রমণের ঘটনায় দু'জন নিহত হয়েছিলেন। গতমাসে বোগরায় একটি শিয়া মসজিদের মুয়েজ্জিনকে হত্যা করা হয়েছে। এ মাসের গোড়ার দিকে জে এম বি জঙ্গিদের ছোঁড়া বোমায় দিনাজপুরের একটি হিন্দু মন্দিরে দশ জন আহত হন। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলিতে বেশ কিছু হিন্দু খ্রিস্টান নেতা মৃত্যুর হুমকি পেয়েছেন। এঁদের মধ্যে কয়েক জন খুব সামান্যের জন্য তাঁদের জীবনের উপর আক্রমণ থেকে বেঁচে গেছেন।

 

সাম্প্রতিক মাসগুলিতে ব্লগার এবং বিদেশিদের উপর আক্রমণ সহ বেশ কিছু হিংসাত্মক ঘটনা দেখেছে বাংলাদেশ। জে এম বি-র জঙ্গি এবং অন্যান্য স্থানীয় চরমপন্থী সংগঠনগুলি এই আক্রমণগুলি করেছিল।

 

আহমেদিয়াদের অমুসলমান ঘোষণা করার দাবিত জে এম বি অনেক দিন ধরেই এই সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। শরিয়া শাসিত একটি একতান্ত্রিক ইসলামি রাষ্ট্র গঠন করে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করাই জে এম বি-র উদ্দেশ্য। ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং আহমেদিয়াদের মত যে সব মুসলমান সম্প্রদায়কে তারা ধর্মবিরোধী বলে মনে করে, তাদের উচ্ছেদ করা এদের লক্ষ্য।

 

মূলত জামাত এবং তার ছাত্র সংগঠন ইসলামি ছাত্র শিবিরের সদস্যদের নিয়ে গড়া জে এম বি ২০০২ সালে থেকে বাংলাদেশ তাদের কার্যকলাপ শুরু করে তালিবান ধাঁচের ইসলামি বিপ্লব করার লক্ষ্য নিয়ে। ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ার পরেও এদের হিংসাত্মক কার্যকলাপে ভাঁটা পড়েনি।

২০০৫ সালের ১৭ই অগাস্ট জে এম বি ঢাকা ছাড়াও দেশের ৬৪ টি জেলার মধ্যে ৬৩ টিতে একই দিনে সুসমন্বিত বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল। বিস্ফোরণস্থলগুলি থেকে আরবি এবং বাংলায় লেখা যে সব লিফলেট পাওয়া গেছিল, সেগুলিতে দেশে খিলাফত প্রতিষ্ঠার ডাক দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, মুসলমানদের ভূমিতে আন্তর্জাতিক আইন অচল এবং গণতন্ত্র ও কম্যুনিজম অবিশ্বাসীদের পথ।

২০০৫ সালের ধারাবাহিক বোমা বিস্ফোরণের পরে পরেই জে এম বি-র আত্মঘাতী মানব বোমার আবির্ভা্ব মানুষকে হতবাক করে দেয়। ২০০৫ সালের ৩রা অক্টোবর একই সঙ্গে তিনটি জেলা আদালতে দেশের প্রথম আত্মঘাতী হানা চালায় জে এম বি। এই ধরণের একই সঙ্গে একাধিক আত্মঘাতী আক্রমণের ঘটনা আবারও ঘটে চট্টগ্রাম এবং গাজিপুর আদালতে, ২৯শে নভেম্বর, ২০০৫ সালে, যাতে ১৩ জন নিহত এবং ৫০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হন।

 

জে এম বি-র আর একটি আত্মঘাতী হানায় ২০০৫ সালের ১৪ই নভেম্বর নিহত হয়েছিলেন দু'জন বিচারক। একই বছরে ডিসেম্বর মাসের প্রথম দিনে আর এক জন আত্মঘাতী বোমারু গাজিপুরের ডেপুটি কমিশনারের অফিসের সামনে বিস্ফোরণ ঘটায়। ডিসেম্বরের ৮ তারিখে অন্য একটি আক্রমণ নেত্রকোণায় দু'টি বিস্ফোরণ মারা যান ৭ জন মানুষ, আহত হন ১০০ জনেরও বেশি।

 

২০০৭ সালে ফাঁসির আগে জে এম বি-র প্রতিষ্ঠাতা শায়ক আবদুর রহমান স্বীকার করে যে, পাকিস্তান, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার সহ বেশ কিছু ইসলামি রাষ্ট্র এবং নিউ ইয়র্কের জোড়া টাওয়ার ধ্বংসে অর্থ যোগান দেওয়া কুয়েতের ইসলামিক হেরিটেজ রিভাইভাল সোসাইটির মত ইসলামি এন জি ও-গুলি থেকে সংগঠনের জঙ্গি কাজকর্ম চালানোর খরচ সরবরাহ করা হত। সব থেকে উল্লেখযোগ্য হল, এই ব্যক্তি প্রকাশ করে যে, আল কায়দা এবং তালিবানের মত আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের সঙ্গে তাদের রীতিমত যোগাযোগ আছে। 

 

শায়কের বক্তব্যে আরও প্রকাশ যে, বিএনপি এবং জামাতের কিছু প্রাক্তন মন্ত্রী এবং এমপি জে এম বি-র মদতদাতা।  প্রাক্তন বাণিজ্যমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরি, প্রাক্তন উপমন্ত্রী রাহুল কুদ্দুস তালুকদার এবং জামাতের প্রধান এবং প্রাক্তন শিল্পমন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামি (যুদ্ধাপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে এখন ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত) সহ জামাতের বেশ কিছু নেতার নাম বিশেষভাবে করে সে। এই সব নেতাদের অথবা তাঁদের দলের থেকে এ বিষয়ে কোনও উত্তর পাওয়া যায়নি।

 

শায়ককে জেরা করে যে সব তথ্য পাওয়া গেছিল, সেগুলি প্রকাশ করা হয়নি এবং তার ফাঁসির সঙ্গে সঙ্গে বহু গুরুত্বপূর্ন খবর হারিয়ে গেছে বলে মনে করা হচ্ছে। জে এম বি-র সেকেন্ড-ইন-কমান্ড সিদ্দিকি ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই এবং সংগঠনের চার জন রিজিওনাল কমান্ডারকে আদালত থেকে ২০০৭ সালে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়। তার পর থেকে বিভিন্ন সময় ধরপাকড় চালিয়ে নিরাপত্তারক্ষীরা বিপুল পরিমাণের বিস্ফোরক উদ্ধার করা ছাড়াও সন্ত্রাসবাদীদের অনেকগুলি সেল ভেঙ্গে দিয়েছে এবং গ্রেপ্তার করেছে জে এম বি-র অনেক জঙ্গিকে। এই পরিমাণের গ্রেপ্তার এবং বিস্ফোরক আটক করা থেকেই বোঝা যায় বাংলাদেশে জে এম বি তার জাল কতটা বিস্তার করেছিল।

 

কিন্তু জে এম বি-র কফিনে শেষ পেরেক পোঁতা হলনা।  সংগঠনের ছ'জন উচ্চপদাধিকারীর ফাঁসি এই জঙ্গি দলের বিরুদ্ধে নিরাপত্তাবাহিনীর ধরপাকড়ে জে এম বি কার্যত পুনর্জীবিত হয়ে নতুন করে আক্রমণ শানাতে এবং সংগঠন বিস্তার করতে থাকে।

জে এম বি-কে শুধুমাত্র নিষিদ্ধ ঘোষণা করে অথবা তাদের নেতা, কর্মীদের উপর ধরপাকড় চালিয়েই কিন্তু এই জঙ্গি দলের কাজকর্মকে আটকানো যাবনা। এদের সমস্ত পৃষ্ঠপোষক এবং মদতদাতাদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করতে হবে এবং সেই সঙ্গে বন্ধ করে দিতে হবে অর্থ যোগানের সমস্ত রাস্তা। তা না করলে জে এম বি-র বিপদ কিন্তু বাড়তেই থাকবে।

 

গোয়েন্দাদের বিশ্বাস যে,  জে এম বি-র ৬৪ জন ডিস্ট্রিক্ট কমান্ডারের মধ্যে ২৫ জন, যারা ২০০৭ সালে  ধরা পড়েনি, তারা এখন সুইসাইড স্কোয়াডের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সহ শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের উপর নতুন করে আক্রমণ হানার জন্য।

 

জে  এম বি-কে শুধুমাত্র নিষিদ্ধ ঘোষণা করে অথবা তাদের নেতা, কর্মীদের উপর ধরপাকড় চালিয়েই কিন্তু এই জঙ্গি দলের কাজকর্মকে আটকানো যাবনা। এদের সমস্ত পৃষ্ঠপোষক এবং মদতদাতাদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করতে হবে এবং সেই সঙ্গে বন্ধ করে দিতে হবে অর্থ যোগানের সমস্ত রাস্তা। তা না করলে জে এম বি-র বিপদ কিন্তু বাড়তেই থাকবে।




Video of the day
More Column News
Recent Photos and Videos

Web Statistics