Column
ইতিহাসের বিকৃতি

07 Jan 2016

#

আওয়ামি লিগ-নেতৃত্বাধীন ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির ক্ষমতায় আগমনে দেশের মানুষ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন এবং পাকিস্তানের একটি উপগ্রহ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার থেকে রক্ষা পায় দেশ । বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ১৯৭১-এর স্বাধীনতাসংগ্রাম ইতিহাস বইয়ে তার প্রকৃত জায়গা পায়। বাংলাদেশের হাইকোর্টকে ধন্যবাদ ২০১২ সালের ২৮শে জানুয়ারি দেশের ইতিহাসের বিকৃতি ঘটানো সমস্ত বইকে বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দেওয়ার জন্য।

যে গৌরবময় সংগ্রামে তিরিশ লক্ষ মানুষ শহিদের মৃত্যু বরণ করেছেন এবং দু' লক্ষেরও বেশি নারীর সম্ভ্রমহানি ঘটেছে, তা নিয়ে তাঁর এই মন্তব্য পরিকল্পিতভাবে ইতিহাসের বিকৃতি ঘটানোরই সামিল। মনে করা হচ্ছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইতিহাসের বিকৃতি ঘটানোর কাজে নেমেছেন বিএনপি নেত্রী। পাকিস্তান এবং স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি জামাত দাবি করে থাকে যে, একাত্তরের সংগ্রামের সময় কোনও গণহত্যা ঘটেনি। তাঁর বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সেই দাবিকেই মান্যতা দিলেন খালেদা। ন' মাস ব্যাপী সংগ্রামের সময় ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের আতিথ্যে থাকা খালেদা জিয়া এমন একটি সময় তাঁর এই মন্তব্য করেছেন, যখন যুদ্ধাপরাধের বিচার চলছে এবং তার বিরুদ্ধে অতি মাত্রায় সরব পাকিস্তান। খালেদা জিয়ার মিত্রদের অধিকাংশই যুদ্ধাপরাধী। স্বাধীনতা সংগ্রাম চলার সময়  দখলদারি পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী ছিল এরা। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসকে বিকৃত করে পরিষ্কার ভাবে পাকিস্তান এবং তাঁর যুদ্ধাপরাধী বন্ধুদেরই পক্ষ নিলেন খালেদা জিয়া।

 

জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্রের আদর্শ ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান প্রেরণা। 'দ্বিজাতি তত্ত্ব'কে ছুঁড়ে ফেলে বাংলাদেশের মানুষ বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মনিরপেক্ষতাকে তাঁদের মন্ত্র করে নিয়েছিলেন। কিন্তু পরিবর্তিত ইতিহাস এই সব ব্যাপারে নীরব রইল।
স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসকে বিকৃত করা অথবা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের অবদানকে খাটো করার অপচেষ্টার ইতিহাসও দীর্ঘ। ১৯৭৫ সালের ১৫ই অগাস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার পর অশুভ পরিকল্পনা নিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী এবং পাকিস্তানপন্থী ইসলামি শক্তিগুলি স্কুল-কলেজের পাঠ্য পুস্তকে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসকে বিকৃত করতে শুরু করে।  পরবর্তী প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের মগজ ধোলাই করে বিপথে চালিত করা এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় হানাদার পাক বাহিনী এবং তাদের স্থানীয় সহযোগীদের ঘৃণ্য ভূমিকার ব্যাপারে তাদের অন্ধকারে রাখাই এই প্রচেষ্টার উদ্দেশ্য ছিল।

 

বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর ধর্মনিরপেক্ষ এবং প্রগতিশীল শক্তি পিছু হটলে তাদের ছেড়ে যাওয়া জায়গা দখল করে পাকিস্তানপন্থী ইসলামি শক্তিগুলি। নবগঠিত রাষ্ট্রটিকে ভেঙ্গে দেওয়া অথবা পাকিস্তানের সঙ্গে তাকে পুনর্মিলিত করা তখন আর সম্ভব নয় এবং সে রকম কোনও প্রচেষ্টা দেশের মানুষের কাছে গ্রহনযোগ্য হবেনা বলে রাষ্ট্রীয় মদতে শুরু করা হল জাতির অস্তিত্বের সর্বোত্তম মূহুর্তগুলির ইতিহাসকে বিকৃত করার কাজ।

 

১৯৭৫-পরবর্তী ইতিহাস বইগুলিতে স্বাধীনতা সংগ্রামের বিবরণী থেকে পাকিস্তানের নামটাই তুলে দেওয়া হল। যে পাকিস্তানি সেনা এবং তাদের স্থানীয় সহযোগীরা ব্যাপক গণহত্যা ঘটিয়েছিল, ধর্ষণ করেছিল বাঙালি নারীদের, ইতিহাস বইতে তাদের 'হানাদার বাহিনী' বলে আখ্যায়িত করা হল। অর্থাৎ চিহ্নিত করা হলনা তারা কারা অথবা বলা হলনা কোথা থেকেই বা  এসেছিল তারা । শুধু তাই নয়, এই হানাদার বাহিনী কী করেছিল, সে বিষয়েও নিরুত্তর রইল ইতিহাস বই।

স্বাধীনতা সংগ্রামের নিরপেক্ষ এবং বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস এবং শেখ হাসিনার উদ্যোগে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হওয়া-এই দু'টি ব্যাপার -একে অন্যের পরিপূরক। বস্তুনিষ্ঠ এবং পক্ষপাতদোষহীন ইতিহাসই বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধ বিচার প্রক্রিয়ার ভিত্তি।

 

এমন কি ১৯৯১-৯৬ এবং ২০০১-০৬ সাল সময়কালে, যখন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি দেশের শাসন ক্ষমতায়, তখন কোনও ইতিহাস বইতে স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় অত্যাচারী পক্ষ হিসেবে পাকিস্তান এবং তার সেনাবাহিনী অথবা তাদের স্থানীয় সহযোগীদের নাম উল্লেখ করতে দেওয়া হতনা। শুধুই 'হানাদার বাহিনী' বলে উল্লেখ করা হত তাদের। এর থেকেই পরিষ্কার, তরুণ প্রজন্ম যাতে সত্য না জানতে পারে, তার জন্য কী গভীর চক্রান্ত করা হয়েছিল। 

 

পাকিস্তানপন্থী ইসলামি শক্তিগুলি, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরোধিতা করেছিল, তাদের চিত্রায়িত করা হতে থাকল ভারতীয় আগ্রাসন বিরোধী হিসেবে। পাঠ্যবইগুলিতে জামাতের চিত্র আঁকা হল স্বাধীনতা সংগ্রামীদের হত্যাকারী এবং মা, মেয়ে, বোনেদের ধর্ষণকারীদের সহযোগী হিসেবে নয়, পাকিস্তানের সার্বভৌমত্বের নিষ্ঠাবান রক্ষাকারী হিসেবে। এই ইতিহাস বইতে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের পাশবিক দমন, গণহত্যা, ধর্ষণ, বাড়ি-সম্পত্তি ধ্বংসের কোনও কথাই লেখা হলনা। তার জায়গায় কী ভাবে ভারতীয় সেনাবাহিনী পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল দখল করেছিল,  লেখা হল সেই গল্প। লেখা হলনা কী ভাবে ভারতের হস্তক্ষেপের ফলে একটি দেশের অসহায় জনগণ নিশ্চিহ্ন হওয়া থেকে বাঁচল। লেখা হলনা নবজাতক রাষ্ট্রকে ভারতের ক্রমাগত আর্থিক সাহায্য দানের কথা। বরং ভারতকে এই ভাবে চিত্রায়িত করা হল, যেন সে নতুন জন্মানো রাষ্ট্রটির উপর ঝাঁপিয়ে পড়া এক হায়না। এমন কি এ কথাও লেখা হল সেই তথাকথিত ইতিহাসে যে, বাংলাদেশের জন্মের ঠিক দু'দিন আগে গণ হারে বুদ্ধিজীবী হত্যার যে ঘটনা ঘটেছিল ১৯৭১ সালের ১৪ই অগাস্ট, তা নাকি ভারতই করিয়েছিল, বৌদ্ধিক দিক থেকে বাংলাদেশকে পঙ্গু করে দেওয়ার জন্য। 

 

এই বিকৃত ইতিহাসে খালেদা জিয়ার স্বামী এবং দেশের প্রথম সামরিক একনায়ক জেনারেল জিয়াউর রহমান, শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকান্ডে যাঁর ভূমিকা প্রশ্নের উর্দ্ধে নয়,তাঁকে চিত্রায়িত করা হল স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান সংগঠক হিসেবে। তাঁর সম্পর্কে অতিশয়োক্তি এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল যে, দেশের তরুণ সম্প্রদায়ের ধারণা হল জিয়াউর রহমান দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা না করলে স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ করা সম্ভব হতনা।

জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্রের আদর্শ ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান প্রেরণা। 'দ্বিজাতি তত্ত্ব'কে ছুঁড়ে ফেলে বাংলাদেশের মানুষ বাঙালি জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মনিরপেক্ষতাকে তাঁদের মন্ত্র করে নিয়েছিলেন। কিন্তু পরিবর্তিত ইতিহাস এই সব ব্যাপারে নীরব রইল।

 

একাত্তর-পরবর্তী প্রজন্ম, যারা তাদের পূর্বপুরুষ এবং স্বাধীনতাসংগ্রামীদের উপর নামিয়ে আনা চরম পাশবিকতা প্রত্যক্ষ করেনি, তারা এই বিকৃত ইতিহাস পড়ে প্রকৃত সত্য এবং বাস্তব সম্পর্কে অন্ধকারেই রইল। এই শ্রেনীর মানুষেরাই পরে তাদের অজ্ঞানতাবশে জামাত নেতা মতিউর রহমান নিজামি ও দেলওয়ার হোসেন সাইদি এবং বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরির মত বহুনিন্দিত পাক-সহযোগী এবং যুদ্ধাপরাধের চক্রীদের ডাস্টবিনে ছুঁড়ে না ফেলে পার্লামেন্টের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত করেছিলেন।

আওয়ামি লিগ-নেতৃত্বাধীন ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির ক্ষমতায় আগমনে দেশের মানুষ স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন এবং পাকিস্তানের একটি উপগ্রহ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার থেকে রক্ষা পায় দেশ । বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ১৯৭১-এর স্বাধীনতাসংগ্রাম  ইতিহাস বইয়ে তার প্রকৃত জায়গা পায়। বাংলাদেশের হাইকোর্টকে ধন্যবাদ ২০১২ সালের ২৮শে জানুয়ারি দেশের ইতিহাসের বিকৃতি ঘটানো সমস্ত বইকে বাজেয়াপ্ত করার আদেশ দেওয়ার জন্য।

 

স্বাধীনতা সংগ্রামের নিরপেক্ষ এবং বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাস এবং শেখ হাসিনার উদ্যোগে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হওয়া-এই দু'টি ব্যাপার -একে অন্যের পরিপূরক। বস্তুনিষ্ঠ এবং পক্ষপাতদোষহীন ইতিহাসই বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধ বিচার প্রক্রিয়ার ভিত্তি।




Video of the day
Recent Photos and Videos

Web Statistics