Column
প্রাপ্য প্রাণদন্ডই পেল নিজামি

14 Jan 2016

#

সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে চার বিচারকের একটি বেঞ্চ সম্প্রতি জামাত-এ-ইসলামি প্রধান মতিউর রহমান নিজামির প্রাণদন্ডের আদেশ বহাল রেখেছেন। অস্ত্র চালান এবং ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধ করার জন্য এর আগে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে ফাঁসির হুকুম হয়েছিল নিজামির। সুপ্রিম কোর্ট তার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা অথবা দেশের প্রেসিডেন্ট ক্ষমা প্রদর্শন না করলে ৭২ বছর বয়সী নিজামির ফাঁসি হতে চলেছে।

একাত্তরে জন্ম নিতে চলা রাষ্ট্রের বুদ্ধিজীবীদের গণহত্যায় খুনে পাকিস্তানি বাহিনীকে সরাসরি সাহায্য করার জন্য এই শাস্তি দেওয়া হয়েছে তাকে। এ ছাড়া ২০১৪ সালে চট্টগ্রামের অস্ত্র পাচার মামলায় এর আগেই ফাঁসির হুকুম হয়েছিল তার।

 

একাত্তরে জন্ম নিতে চলা রাষ্ট্রের বুদ্ধিজীবীদের গণহত্যায় খুনে পাকিস্তানি বাহিনীকে সরাসরি সাহায্য করার জন্য এই শাস্তি দেওয়া হয়েছে তাকে। এ ছাড়া ২০১৪ সালে চট্টগ্রামের অস্ত্র পাচার মামলায় এর আগেই ফাঁসির হুকুম হয়েছিল তার।
যুদ্ধাপরাধ মামলায় তার বিরুদ্ধে অকাট্য প্রমাণাবলী থাকায় নিজামিকে শাস্তির হাত থেকে বাঁচানোর কোনও উপায় নেই বুঝে তার উকিল খোন্দকার মাহমুদ হোসেন ১লা ডিসেম্বর, ২০১৫ তারিখে সুপ্রিম কোর্টের কাছে আপীল করেছিলেন এই বলে যে, দোষী সাব্যস্ত হলে তাঁর মক্কেলকে যেন প্রাণদন্ড না দিয়ে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া হয়। অর্থাৎ, নিজামি যে চরম অপরাধ করেছিল, তা স্বীকার করে নেওয়া হল।

 

একাত্তরের সংগ্রামের সময় সন্ত্রাস নামিয়ে আনা নির্দয় আল-বদর বাহিনী গঠনের অন্যতম কারিগর নিজামি নিরস্ত্র অসামরিক নাগরিকদের খুন করেছে,  বাঙালি নারীদের ধর্ষণ করেছে, লুঠ করেছে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সম্পত্তি। সংগ্রামের শেষ দিকে  পাকিস্তানের পরাজয় আসন্ন বুঝে পাকিস্তান বাহিনীর স্থানীয় দোসর আল-বদর পরিকল্পিত ভাবে জাতির উজ্জ্বলতম ব্যক্তিদের ধরে নিয়ে গিয়ে অত্যাচারের পর হত্যা করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল তখনও জন্ম না নেওয়া বাংলাদেশকে চিন্তা-ভাবনার দিক দিয়ে পঙ্গু করে দেওয়া। দখলদারি পাকিস্তানি বাহিনীর সহায়ক সেই আল-বদর জঙ্গি বাহিনীর পুরোভাগে সেই সময় ছিল এই  নিজামি।

 

স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধ করা দায়ে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল-১ ২০১৪ সালের ২৯শে অক্টোবর মৃত্যুদন্ড দিয়েছিল নিজামিকে। গণহত্যা, পরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা, হত্যার ষড়যন্ত্র এবং ধর্ষণে যুক্ত ছিল এই ব্যক্তি। রায় দানের সময় আই সি টি-র বিচারক বলেছিলেন, যে ভয়ানক অপরাধ নিজামি করেছে, মৃত্যুই তার একমাত্র উপযুক্ত শাস্তি।

 

সাধীনতা সংগ্রামী এবং মুক্তিযুদ্ধের সমর্থকদের হত্যা করা ছাড়াও নিজামির নেতৃত্বাধীন আল-বদর বাংলাদেশের ইসলামিকরণের উদ্দেশ্যে এক তাত্ত্বিক যুদ্ধ শুরু করেছিল। এই কারণে এই জঙ্গি বাহিনী হিন্দু এবং মুসলমান-উভয় সম্প্রদায় থেকেই ধর্মনিরপেক্ষ মানুষদের বেছে নিয়ে তাঁদের খতম করেছিল। স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় এবং তার পরে দেশের ভিতরে এবং বাইরে বিভিন খবরের কাগজে ছাপা হয়েছে নিজামি এবং তার আল-বদর বাহিনীর হাতে বুদ্ধিজীবী হত্যার ভয়ংকর কাহিনী।

 

স্বাধীনতা সংগ্রামীদের হত্যা, তাদের উপর অত্যাচার করে পঙ্গু করে দেওয়া এবং তাঁদের সম্পত্তি লুঠ করা, বাঙালি নারীদের ধর্ষণ, প্রভৃতি বহু নারকীয় ঘটনায় সরাসরি যুক্ত ছিল নিজামি। জামাত এবং তার ছাত্র সংগঠন ইসলামি ছাত্র সংঘ, যার নেতৃত্বে ছিল সে,  পরিণত হয়েছিল আল-বদরে। ঐতিহাসিকভাবে  স্বাধীনতাবিরোধী একটি শক্তি হিসেবে পরিচিত এই সংগঠনটি ন'মাসব্যাপী অত্যাচার চালানো দখলদারী পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেছিল।

 

আল-বদরের পাশাপাশি আই এস আই-সৃষ্ট কুখ্যাত রাজাকার সংগঠনেরও এক জন শীর্ষ নেতা ছিল নিজামি। এই রাজাকার ছিল আজকের তালিবানের পূর্বসূরী। আরবিতে রাজাকার শব্দের অর্থ স্বেচ্ছাসেবক হলেও বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে এর অর্থ দেশদ্রোহী এবং দখলদার পাক বাহিনীর সহযোগী।


স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় এই রাজাকারই  স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং তাদের সমর্থকরা কোথায় আছে, তার খবরাখবর সরবরাহ করত পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে। শুধু তাই নয়, তাদের তুলে নিয়ে গিয়ে বিভিন্ন বধ্যভূমিতে হত্যা করা, তাদের বাড়ি-সম্পত্তি জ্বালিয়ে দেওয়া, বাঙালি নারীদের অপহরণ করে পাকিস্তানি সেনা শিবিরে পাচার করা অথবা  এই ধরণের অগুনতি মহিলাকে ধর্ষণ করার কাজেও জড়িত ছিল এই সংগঠন।

স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় এই রাজাকারই স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং তাদের সমর্থকরা কোথায় আছে, তার খবরাখবর সরবরাহ করত পাকিস্তানি বাহিনীর কাছে। শুধু তাই নয়, তাদের তুলে নিয়ে গিয়ে বিভিন্ন বধ্যভূমিতে হত্যা করা, তাদের বাড়ি-সম্পত্তি জ্বালিয়ে দেওয়া, বাঙালি নারীদের অপহরণ করে পাকিস্তানি সেনা শিবিরে পাচার করা অথবা এই ধরণের অগুনতি মহিলাকে ধর্ষণ করার কাজেও জড়িত ছিল এই সংগঠন।

 

১৯৭১ সালে জামাতের নিজস্ব মুখপত্র 'দৈনিক সংগ্রাম'-এর বিভিন্ন সংখ্যায় ছাপা হওয়া প্রতিবেদনগুলি থেকে এ কথা পরিষ্কার যে, 'ইসলামের শত্রু' মুক্তিযোদ্ধা এবং স্বাধীনতাসংগ্রামের সমর্থকদের বিরুদ্ধে তরুণদের প্ররোচিত করতে নিজামি ইসলামের বিকৃত ব্যাখ্যা দিয়ে বক্তৃতা করত। সংগ্রামের পরিপ্রেক্ষিতে এই সব ভুল বার্তা, যেমন, 'পাকিস্তান আল্লাহর বাসস্থান,' 'হিন্দুরা ইসলামের শত্রু' কিংবা 'পাকিস্তান এবং ইসলাম এক এবং অবিভাজ্য', সত্যি হিসেবে তরুণদের মগজে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ইসলামি আদর্শের নামে এই প্রচারে প্ররোচিত হয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে ভয়ংকর সব অত্যাচারের ঘটনা ঘটিয়েছিল তারা।

 

একাত্তরে স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ জন্মগ্রহন করা সঙ্গে সঙ্গেই নিজামি দেশ ছেড়ে পালিয়েছিল, কিন্তু ১৯৭৫ সালে রাষ্টের জনক শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার পর ফিরে আসে সে। যে জঘন্য অপরাধ নিজামি করেছিল, তার জন্য শাস্তি দেওয়ার বদলে দেশের প্রথম সামরিক শাসক এবং বিএনপি-র প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমান তাকে পুনর্বাসন দেন। ক্রমে ক্রমে বিপুল রাজনৈতিক ক্ষমতা  অর্জন করা  নিজামি ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দেশের শাসনক্ষমতায় থাকা বিএনপি-নেতৃত্বাধীন চার দলের জোট সরকারে মন্ত্রীও হয়। এ এক চরম লজ্জা যে, দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করা এক ঘৃণ্য যুদ্ধাপরাধী মন্ত্রী হয়ে সরকারে গাড়িতে দেশের জাতীয় পতাকা উড়িয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে সেই সময়।

 

যুদ্ধাপরাধের বিষয়ে বিশিষ্ট গবেষক শাহরিয়ার কবির তাঁর বক্তব্যে বলেছেন, সুপ্রিম কোর্ট নিজামির প্রাণদণ্ড বহাল রাখায় যে সব মানুষ যুদ্ধাপরাধের বিচার চাইছিলেন, তাঁরা আনন্দিত, কিন্তু  আরও বেশি খুশি হতেন তাঁরা যদি নিজামির সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে কিছু ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হত তার  হাতে খুন হওয়া ব্যক্তিদের হতভাগ্য পরিবারগুলির জন্য।




Video of the day
More Column News
Recent Photos and Videos

Web Statistics