Column
তত্ত্বাবধায়ক সরকারঃ খালেদা জিয়ার আবদার

25 Jan 2016

#

একটি নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সংসদীয় নির্বাচন করার জন্য সর্বদলীয় আলোচনার দাবি করেছেন বিএনপি-র চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া।
তাঁর বক্তব্য, তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রথা বাতিল করার ফলেই দেশে বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি উদ্ভূত হয়েছে। তাই গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার এবং দীর্ঘ দিন ধরে রাজনৈতিক সংকটের অবসান ঘটাতে অবিলম্বে সেই প্রথা ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন।


"বর্তমান সরকার এবং সংসদ অবৈধ, কারণ ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি দেশে কোনও নির্বাচনই হয়নি," নির্বাচনের দ্বিতীয় বার্ষিকীর দিন তিনি বলেছেন। তাঁর বিএনপি নির্বাচনের এই দিনটিকে 'গণতন্ত্র হত্যা দিবস' বলে অভিহিত করে থাকে। কিন্তু এই নির্বাচনের আগে বিএনপি এবং তার মিত্র দলগুলি যে হিংসাত্মক এবং পাশবিক কান্ড কারখানা ঘটিয়েছিল, তা দেশের মানুষকে একাত্তরে দখলদারি পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী এবং তাদের স্থানীয় সহযোগীদের বর্বরতার কথা স্মরণ করিয়ে  দেয়।


সংসদীয় নির্বাচন দেখভাল করার জন্য বাংলাদেশে কোনও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজন নেই। স্বাধীনতার পর ৪৫ বছরে একটি অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের খবরদারির কোনও দরকারই নেই রাজনৈতিক নেতাদের। এখন তাঁরা ব্যক্তিগত, পেশাগত এবং রাজনৈতিক ভাবে আগের থেকে অনেক পরিণত। সর্বোপরি, পৃথিবীর কোনও দেশেই নির্বাচনের তদারকী করার জন্য অনির্বাচিত সরকার গঠন করার অদ্ভুত ব্যবস্থা নেই।
২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আওয়ামি লিগ নির্বাচনে জয়লাভ করে উপর্যুপরি দ্বিতীয়বার আরও পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতায় আসে। কারচুপি হবে, এই ধুয়া তুলে খালেদা জিয়ার বিএনপি এই নির্বাচন বয়কট করেছিল । নির্বাচিত সরকারকে 'অবৈধ' আখ্যা দিয়ে সেই থেকেই বিএনপি একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নতুন করে নির্বাচন করার দাবি করে আসছে। অবশ্য পরবর্তী নির্বাচন যে ২০১৯ সালে, অর্থাৎ যখন হওয়ার তখনই হবে, সে ব্যাপারে  দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে সরকার।

২০১১ সালের মাঝামাঝি সুপ্রিম কোর্টের আদেশবলে ১৫তম সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রথাকে বাতিল করে দেওয়া হয়েছিল। সংসদীয় নির্বাচনের দেখাশোনা করার জন্য তত্তাবধায়ক সরকার প্রথা চালু করার উদ্দেশ্যে যে ১৩ তম সাংবিধানিক সংশোধনী আনা হয়েছিল তাকে অবৈধ বলে ঘোষণা করে সুপ্রিম কোর্ট।


১৯৯৬ সালে বিএনপি নির্বাচনের মুখোমুখি না  হওয়ার জন্য জেদ ধরে থাকে এবং বাংলাদেশের সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রথা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। গোটা গণতান্ত্রিক নির্বাচনী যন্ত্রকে বিপর্যস্ত করে দলের অনুগতদের যাবতীয় গুরুত্বপূর্ন পদে বসিয়ে ফের বিএনপি-র ক্ষমতায় ফেরার রাস্তা তৈরি করা হয়েছিল সেই সময়। এই পরিস্থিতিতে সংবিধানের সংশোধনী এনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রথা চালু করা হয়।


দেখা যাক কি হয়েছিল ২০০৬ থেকে ২০০৮ সালের মধ্যে, শাসনকাল সম্পূর্ন করে বি এন পি-নেতৃত্বাধীন জোট সরকার  তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়ার পরে। ওই সময়ে যে উত্তাল রাজনৈতিক বিক্ষোভ দেখা দিয়েছিল বাংলাদেশে তার প্রাথমিক কারন ছিল এই যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা আয়াজুদ্দিন আহমেদ বি এন পির এজেন্ট হিসেবে কাজ করছিলেন।  নির্বাচনী প্রক্রিয়া দেখভাল করা তাঁর অধীনস্থ প্রশাসন আবার যাতে বি এন পি যাতে ক্ষমতা দখল করতে পারে সেই উদ্দেশ্যে ২০০৭ সালে একটা লোক দেখানো নির্বাচন করার চেষ্টা করছিল। নির্বাচনের ফলাফল যাতে বিএনপি-র পক্ষে যায়, সেই উদ্দেশ্যে নির্বাচক তালিকাতেও ব্যাপক কারচুপি করেছিল এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, এই নির্বাচন শেষ পর্যন্ত হতে পারেনি।


সংসদীয় নির্বাচন দেখভাল করার জন্য বাংলাদেশে কোনও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজন নেই। স্বাধীনতার পর ৪৫ বছরে একটি অনির্বাচিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের খবরদারির কোনও দরকারই নেই রাজনৈতিক নেতাদের। এখন তাঁরা ব্যক্তিগত, পেশাগত এবং রাজনৈতিক ভাবে আগের থেকে অনেক পরিণত। সর্বোপরি, পৃথিবীর কোনও দেশেই নির্বাচনের তদারকী করার জন্য অনির্বাচিত সরকার গঠন করার অদ্ভুত ব্যবস্থা নেই।


২০০৭ সালে সামরিক বাহিনীর মদতপুষ্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই ধরণের প্রথার গলদগুলি প্রকট হয় এবং গণতন্ত্রের অগ্রগমণকে ব্যহত করে এক গভীর রাজনৈতিক সংকটের ভিতর চলে যায়  বাংলাদেশ। সামরিক মদতে দু'বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার যাবতীয় গণতান্ত্রিক রীতিনীতি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের যথাসাধ্য ধ্বংস সাধন করেছিল।

থেকে থেকেই খালেদা জিয়া বর্তমান সংসদকে 'অসাংবিধানিক' এবং সরকারকে 'অবৈধ' বলে গাল পাড়েন, কারণ গত নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করা হয়নি এবং তাঁর দল সেই নির্বাচন বয়কট করেছিল।


কিন্তু খালেদা জিয়ার 'অসাংবিধানিক সংসদ' এবং 'অবৈধ সরকার'-এর তত্ত্ব মানছেন না মানুষ। সম্প্রতি বাংলাদেশ সংসদের স্পিকার শিরিন শর্মিন চৌধুরি এবং আওয়ামি লিগের এম পি সাবের হোসেন চৌধুরি যথাক্রমে কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়েশন এবং ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। এই নির্বাচনে ভোট দিয়েছিলেন ১৮৮টি দেশের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা। দু'টি খ্যাতনামা আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষপদে এই দু'জনের নির্বাচন স্বাভাবিক ভাবেই খালেদা জিয়ার অভিযোগকে উড়িয়ে দিয়ে দেশ এবং শেখ হাসিনা সরকারকে বিশ্বের আঙিনায় উঁচু জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করে।


বিএনপি এবং তার মিত্র দলগুলি দেশের উন্নয়নের জন্য এ পর্যন্ত তাদের নিজেদের কোনও অর্থনৈতিক কর্মসূচী পেশ করেনি। দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি করে সরকারের পতন ঘটিয়ে কী ভাবে ক্ষমতা দখল করা যায়, সে ব্যাপারেই তাদের যাবতীয় মনোযোগ নিবদ্ধ বলে মনে হয়। এরা গণতন্ত্রের ব্যাপারে অতি সরব, কিন্তু নিজেরা ক্ষমতায় থাকার সময় কী ভাবে সেই গণতন্ত্রকে তারা ব্যবহার করেছিল, সে কথা সকলেরই জানা।
যত দিন না বিএনপি উন্নততর প্রশাসনের ব্যাপারে তাদের কর্মসূচী ঘোষণা করছে এবং জামাত সহ অন্যান্য পাকপন্থী, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিগুলির সঙ্গে তাদের সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করছে, তত দিন পর্যন্ত কিন্তু গণতন্ত্র নিয়ে খালেদা জিয়ার কুম্ভীরাশ্রুতে মানুষ ভুলছেন না। বিএনপি-র অতীত কোনও দিনই পরিচ্ছন্ন নয়। স্বাধীনতাবিরোধী এবং পাকিস্তানপন্থী শক্তিগুলির সঙ্গে তাদের বন্ধুত্বের ফলেই চরমপন্থী, উগ্রবাদী শক্তিগুলি আজ মাথাচাড়া দিয়ে দেশে অস্থিরতা, সাম্প্রদায়িক বিভেদ সৃষ্টি করতে পারছে।


তাঁর বক্তব্যে খালেদা জিয়া এ কথা বলেননি কেন এবং কী ভাবে তাঁর সরকারের সময় দেশের এবং বাইরের সন্ত্রাসবাদীরা বাংলাদেশকে তাদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছিল, কী করে বিদেশে, বিশেষত ভারতের মাটিতে বিশৃংখলা সৃষ্টি করতে চাওয়া এতগুলি পাকিস্তানি সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলি বাংলাদেশে ঠাঁই করে নিয়েছিল এবং সেখানে তাদের পৃষ্ঠপোষক পেয়েছিল। তিনি এ কথাও উল্লেখ করেননি, দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের প্রয়োজন মেটাতে কেন তাঁর সরকার প্রাকৃতিক সম্পদের অনুসন্ধান এবং তার সদ্ব্যাবহার করেনি অথবা কেন বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তোলেনি ? তাঁর ব্যর্থতা, যা দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ, জল এবং গ্যাস সংকটের জন্য প্রধানত দায়ী, তা স্বীকার করা উচিৎ খালেদা জিয়ার।


তাঁর ভাষণে কোথাও, কোনও দিন খালেদা জিয়া জানাননি কেন তাঁর সরকার আওয়ামি লিগের অগ্রগণ্য নেতা-নেত্রী এ এস এম এস কিব্রিয়া, আহসানুল্লা মাস্টার, আইভি রহমান এবং কিছু সাংবাদিকের হত্যাকারীদের ধরার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়নি, কেন ২০০৪ সালে শখ হাসিনা এবং আওয়ামি লিগের অন্যান্য শীর্ষ নেতাদের হত্যা করার উদ্দেশ্যে আক্রমণ চালানো সন্ত্রাসবাদীদের খুঁজে বার করেননি তিনি এবং কেন চাঞ্চল্যকর চট্টগ্রাম অস্ত্র পাচার মামলাটিকে হিমঘরে পাঠানো হয়েছিল? দেশের মানুষ এই সমস্ত প্রশ্নের জবাব চান।


এখন খালেদা জিয়া স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিগুলিকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানাতে পারছেননা এই ভয়ে যে, তা হলে দেশের মানুষ তাঁর প্রতি বিরূপ হবে। কারণ মানুষ  যুদ্ধাপরাধী, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি এবং পাকিস্তানের সহযোগীদের বিচার চান। দেশের মানুষের চিন্তাশক্তি ভোঁতা হয়ে যায়নি। খালেদা জিয়ার বোঝা দরকার যে, বাস্তব পরিস্থিতিতে দ্রুত তাঁর পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি এবং সন্ত্রাসবাদী কাজকর্মে যুক্ত শক্তিগুলির সঙ্গে তাঁর দলের দীর্ঘ সখ্যের কথা মানুষ কিন্তু ভুলে যান নি।


যত দিন না বিএনপি উন্নততর প্রশাসনের ব্যাপারে তাদের কর্মসূচী ঘোষণা করছে এবং জামাত সহ অন্যান্য পাকপন্থী, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিগুলির সঙ্গে তাদের সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করছে, তত দিন পর্যন্ত কিন্তু গণতন্ত্র নিয়ে খালেদা জিয়ার কুম্ভীরাশ্রুতে মানুষ ভুলছেন না। বিএনপি-র অতীত কোনও দিনই পরিচ্ছন্ন নয়। স্বাধীনতাবিরোধী এবং পাকিস্তানপন্থী শক্তিগুলির সঙ্গে তাদের বন্ধুত্বের ফলেই চরমপন্থী, উগ্রবাদী শক্তিগুলি আজ মাথাচাড়া দিয়ে দেশে অস্থিরতা, সাম্প্রদায়িক বিভেদ সৃষ্টি করতে পারছে।


মানুষ জানতে চান, আজ যদি বিএনপি ক্ষমতায় ফেরে, তাহলে কী পাবে দেশ। কেন আনা হবে তাদের ক্ষমতা? যাতে আরও বাংলাভাই, আবদুর রহমান, মুফতি হান্নান তৈরি হয়, সেই উদ্দেশ্যে ? যাতে ২১ শে অগাস্টের ঘটনার মত আরও গ্রেনেড আক্রমণের ঘটনা ঘটে, সেই জন্য ? যাতে বাংলাদেশবিরোধী কর্মসূচী সফল করতে জামাত বিএনপি-র উপরে খবরদারি করে, তার জন্য? যুদ্ধাপরাধীদের যাতে জেল থেকে মুক্ত করে আবার সগৌরবে পুনর্বাসন দেওয়া যায়, সেই কারণে ? উত্তর দিতে হবে খালেদা জিয়াকে।

 




Video of the day
Recent Photos and Videos

Web Statistics