Column



চিনা ঋণ অথবা ঋণের ফাঁদ
চিনা ঋণ অথবা ঋণের ফাঁদ
ঢাকায় চিনা দূতাবাসের ইকনমিক অ্যান্ড কমার্শিয়াল কাউন্সেলর লি গুয়াংজুন সাইনো- বাংলাদেশ জয়েন্ট ইকনমিক কাউন্সিলের একটি সাম্প্রতিক বৈঠকে প্রেসিডেন্ট শি জিনিপিঙের ঢাকা সফরের সময় ঘোষিত সফট লোনকে কমার্শিয়াল ক্রেডিট অথবা বাণিজ্যিক ঋণে পরিবর্তিত করার প্রস্তাব দিয়েছেন। এর অর্থ বাংলাদেশকে বেশি হারে সুদ দিতে হবে।

চিনা আধিকারিকরা দাবি করছেন, চিনা প্রেসিডেন্টের সফরের সময় দু'দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রকল্পগুলি যে জি- টু- জি (গভর্নমেন্ট টু গভর্নমেন্ট )-ভিত্তিতে রূপায়িত হবে, এমন প্রতিশ্রুতি বেজিং দেয়নি। তাঁরা বলছেন, বাংলাদেশ এইসব প্রকল্পগুলির জন্য যৌথভাবে অর্থ যোগান দিতে পারে।

 

এখানে একটা কথা বলা দরকার। যাতে ঋণের ফাঁদে না পড়তে হয়, তার জন্য চিনের শর্তাবলী মেনে নেওয়ার আগে ঢাকার উচিত অন্যান্য দক্ষিণ এশিয় দেশগুলির অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া।
বৈঠকের সময় চিন বাংলাদেশকে বলেছিল যে, ৩৪ টি প্রকল্পের জন্য ২৫ বিলিয়ন ডলার অর্থ সাহায্যের কতটা  সফট লোন, কতটা কমার্শিয়াল ক্রেডিট আর কতটাই বা বাংলাদেশ সরকার দেবে, তার একটি বিশদ তালিকা দেওয়া হবে।

 

ঋণের প্রকৃতি পরিবর্তন করার জন্য চিনের এই উদ্যোগে বাংলাদেশ অবশ্য বাধা দিয়েছে।  বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, চুক্তিগুলি নেতৃস্থানীয় স্তরে, বিশেষ করে দু'দেশের সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিদের উপস্থিতিয়ে স্বাক্ষরিত হয়েছিল এবং সেখানে কমার্শিয়াল ক্রেডিট নয়, সফট লোনের কথাই বলা হয়েছিল।

 

গত বছরে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিঙের ঢাকা সফরের সময় বাংলাদেশ চিনের সংগে মোট ২৫ বিলিয়ন ডলারের কিছু প্রকল্পের জন্য চুক্তি করেছিল।

 

এখানে একটা কথা বলা দরকার। যাতে ঋণের ফাঁদে না পড়তে হয়, তার জন্য  চিনের শর্তাবলী মেনে নেওয়ার আগে ঢাকার উচিত অন্যান্য দক্ষিণ এশিয় দেশগুলির অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া।

 

শ্রীলংকায় চিনা লগ্নি এখন শ্রীলংকার প্রেসিডেন্ট   মইথ্রীপলা সিরিসেনার দারুণ শীরঃপীড়া কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শ্রীলংকা-চিনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কেও   তার ছাপ পড়েছে। শ্রীলংকার ভূতপূর্ব প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপক্ষের শাসনকালে কতকগুলি বৃহৎ প্রকল্প নির্মাণের জন্য চিন শ্রীলংকাকে বিপুর পরিমাণে ঋণ দিয়েছিল। শোনা যায় বহু ক্ষেত্রেই উৎকোচের মধ্য দিয়ে চিনা কোম্পানিগুলি কোনও ওপেন বিডিং ছাড়াই এইসব প্রকল্পগুলির বরাত পেয়েছিল।

ছোট দেশগুলির উপর ঋণের বোঝা বেশি করে চেপে বসার সঙ্গে সঙ্গে সে সব দেশে চিন বেশি করে সুবিধাজনক অবস্থায় চলে যাচ্ছে। পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্য চিনের দেওয়া ঋণ স্বাগত, কিন্তু ঋণ গ্রহীতারা যেন তার বিপদগুলির ব্যাপারে সচেতন থাকে। এই সব ঋণের অর্থনৈতিক ব্যাপারগুলিতে প্রায়ই স্বচ্ছতার অভাব থাকে। ঋণ গ্রহীতা দেশগুলির উচিত বুঝে নেওয়া এতে তারা লাভবান হবে কি হবেনা।

 

সমালোচকদের আশংকা, শ্রীলংকার পক্ষে এই বিপুল ঋণ শোধ করা সম্ভব না-ও হতে পারে এবং তার ফলে এই সব গুরুত্বপূর্ন পরিকাঠামো-ভিত্তিক প্রকল্পগুলির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারে চিন। কলম্বো পোর্ট সিটি প্রোজেক্ট এরকমই একটি বিতর্কিত  প্রকল্প। চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির সাবসিডিয়ারি চায়না কমুনিকেশন কন্সট্রাকশন কোম্পানি এটি নির্মাণ করেছিল শ্রীলংকা পোর্ট অথরিটির সহযোগিতায়। ১.৪ বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পটি  সি সি সি সি -র মত কোম্পানিকে দেওয়া হয়, যে কোম্পানিকে দূর্নীতির দায় ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক ২০১৭ সাল অবধি কালো তালিকাভুক্ত করে রেখেছে। প্রকল্পটির কাজ শুরু হয় ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে।

 

শ্রীলংকায় অন্য যে সব পরিকাঠামোমূলক প্রকল্পের জন্য চিন ঋণ দিয়েছে, সেগুলির মধ্যে আছে হাম্বানটোটা পোর্ট, মাহিন্দা রাজাপক্ষে ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট এবং হাম্বানটোটায় একটি ক্রিকেট স্টেডিয়াম। দেখা গেছে, এই সব ক'টি প্রকল্প থেকে কোনও লাভ হওয়া দূরের কথা, বিপুল ক্ষতি হচ্ছে। এর কারণ, বাণিজ্যিক দিক থেকে এগুলি চলার মত নয়। কিন্তু এই বিপুলাকার প্রকল্পগুলির  ব্যর্থতা আবার চিনের উদ্দেশ্যসাধন করে। 

 

এই মূহুর্তে শ্রীলংকার সরকারি রাজস্বের ৯০ শতাংশই যায় ঋণ পরিশোধ করতে। শ্রীলংকা জানেনা কী ভাবে এই পরিকাঠামি-প্রকল্পগুলিকে লাভজনক করে তুলে ধার ফেরত দেওয়া যাবে। এই অবস্থায় এখন তারা চিনের দিক থেকে অসম্ভব চাপের মধ্যে রয়েছে, বিশেষত কলম্বো পোর্ট সিটি প্রকল্পের ব্যাপারে, যেখানে সি সি সি দৈনিক ৩৮০,০০০ ডলার ক্ষতি হচ্ছে বলে দাবি করছে। পরিবেশ বিভাগের ছাড়পত্র না থাকায় কলম্বো পোর্ট সিটি বাতিল করে দেওয়ার চাপও আছে। কিন্তু বাতিল করার ব্যাপারে চিন মোটেই রাজি নয়, কারণ এই প্রকল্প  ভারতীয় মহাসাগরে   তাদের কৌশলগত অবস্থান নিশ্চিত করেছে। 

 

উপায়ন্তর না থাকায় শ্রীলংকা সরকার ১.৫ বিলিয়ন ডলারের   হাম্বানটোটা ডিপ সী প্রকল্পটির ৮০ শতাংশ ৯৯ বছরের লিজে একটি  চিনা কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ঋণের ফাঁস থেকে বাঁচতে চিনকে এই অঞ্চলে একটি ইনভেস্টমেন্ট জোনও উপহার দিতে চেয়েছে শ্রীলংকা। সম্প্রতি বৌদ্ধ  সন্যাসীদের নেতৃত্বে একটি দল দ্বীপে চিনা বিনিয়োগের সুবিধার জন্য ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন করার বিরোধিতা করে রাস্তায়, নেমে বিক্ষোভ দেখিয়েছে। এই প্রতিবাদের প্রধান কারণ, বিশাল একটি জমি ইনভেস্টমেন্ট জোনের নামে অন্যের হাতে তুলে দিলে তা বিদেশি শক্তির কাছে স্বাধিকার হারানোর সামিল হয়।

 

শ্রীলংকা থেকে আসা খবরের ইঙ্গিত, চিন ওই ইনভেস্টমেন্ট জোনটি বিভিন্ন ধরণের সামগ্রী তৈরির কাজে ব্যবহার করবে এবং শ্রীলংকা ভারতের থেকে যে মুক্ত বাণিজ্যের সুবিধা পায়, তার সুবিধা নিয়ে সেগুলি ভারতে রপ্তানি করবে তারা।  সর্বোপরি, শ্রীলংকার মানুষ চিন্তিত এই ভেবে যে, সময়ের সংগে ওই জায়গাটি চিনা কলোনিতে পরিণত হবে।  নরচ্ছোলাই বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ার জন্য নেওয়া ঋণ পরিশোধ  করতে না পারায় শ্রীলংকা সরকার সেটির মালিকানা এখন ডেট-ইকুইটি সোয়াপের ভিত্তিতে  চিনাদের হাতে তুলে দিচ্ছে।

 

হাম্বানটোটা পোর্ট যেমন  সমুদ্রপথে চিনের সিল্ক রুটের পক্ষে অতি গুরুত্বপূর্ন কেন্দ্র, সেরকম পাকিস্তানের গদর পোর্টও ইরান এবং উপসাগরীয় দেশগুলি থেকে তেল এবং গ্যাস সরবরাহের মাধ্যমে  নির্দিষ্ট সমুদ্রপথগুলির উপর  নিয়ন্ত্রণ কায়েম করার লক্ষ্যে চিন ও পাকিস্তানের একটি যৌথ কর্মকেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই গদর পোর্ট চিনকে ২০৫৯ পর্যন্ত লিজে দেওয়া আছে। এই বন্দর প্রকল্পটির জন্য চিন ৩.৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছিল। চিন-পাকিস্তান ইকনমিক করিডোরের মধ্যে যে সব প্রকল্প আছে, সেগুলি সব মিলিয়ে ৫১ বিলিয়ন ডলারের। চিনের অর্থানুকুল্যে গড়া এই  ইকনমিক করিডোর থেকে কে লাভবান হবে, সে বিষয়ে পাকিস্তানের মধ্যেও সন্দেহ আছে।  তবে পাকিস্তানের বিশিষ্টজনদের মতানুযায়ী, আর্থিক সুবিধার দিক দিয়ে দেখতে গেলে চিন-ই প্রকৃত এবং কার্যত লাভবান হবে।

 

নেপালেও একই ঘটনা।  চিনের পরিকল্পনা,  কিংঘাই-তিব্বত রেলপথকে ২০২০ সালের মধ্যে নেপাল পর্যন্ত প্রসারিত করা । নেপালের ব্যাপারে চিনের আগ্রহ বৃদ্ধির প্রধান কারণ দীর্ঘদিন ধরে নেপালে চলতে থাকা অস্থিরতা এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে তিব্বত বিপদগ্রস্ত হতে পারে বলে তাদের আশংকা। নেপালের ব্যাপারে চিনের নীতিতে বেশ বড় রকমের পরিবর্তন আসে বেজিং অলিম্পিকস গেমসের অব্যবহিত আগে বিশ্বজুড়ে তিব্বতিরা চিন-বিরোধী প্রতিবাদ-বিক্ষোভ দেখানোর পর। ভারতীয় উপমহাদেশের রাষ্ট্রগুলিকে তোয়াজ করে নিজদের ঈপ্সিত 'ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড' পরিকল্পনার অংশীদার করার উদ্দেশ্যে নিজেদের অর্থনৈতিক এবং সামরিক প্রভাবকে ক্রমাগতভাবে ব্যবহার করছে চিন। 

 

ছোট দেশগুলির উপর ঋণের বোঝা বেশি করে চেপে বসার সঙ্গে সঙ্গে সে সব দেশে চিন বেশি করে সুবিধাজনক অবস্থায় চলে যাচ্ছে। পরিকাঠামো  উন্নয়নের জন্য চিনের দেওয়া ঋণ স্বাগত, কিন্তু ঋণ গ্রহীতারা যেন তার বিপদগুলির ব্যাপারে সচেতন থাকে। এই সব ঋণের   অর্থনৈতিক ব্যাপারগুলিতে প্রায়ই স্বচ্ছতার অভাব থাকে। ঋণ গ্রহীতা দেশগুলির উচিত বুঝে নেওয়া এতে তারা লাভবান হবে কি হবেনা।




Video of the day
Today Bangla News
Recent Photos and Videos

Web Statistics